জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআরের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেছেন, বাণিজ্য সহজীকরণ, দ্রুত পণ্য খালাস এবং শুল্ক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বাড়ানোই এখন সংস্থাটির প্রধান লক্ষ্য। এ উদ্দেশ্যে শুল্ক ব্যবস্থায় বিস্তৃত সংস্কার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, নিয়ম মেনে চলা করদাতাদের জন্য প্রক্রিয়া সহজ করা হবে। একই সঙ্গে মিথ্যা ঘোষণা, কম মূল্য দেখানো এবং রাজস্ব ফাঁকির মতো অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শুল্ক মূল্যায়নে শৃঙ্খলা আনতে উদ্যোগ
এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, শুল্ক মূল্যায়নে শৃঙ্খলা আনতে বড় ধরনের সংস্কার চলছে। এখন থেকে মূলত ইনভয়েসের ঘোষিত মূল্যের ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করা হবে। এ প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করতে ঝুঁকিভিত্তিক শারীরিক পরীক্ষা ব্যবস্থা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তিনি বলেন, সফটওয়্যারটি পুরোপুরি চালু হলে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিশন উচ্চঝুঁকিপূর্ণ চালানগুলো যাচাইয়ের জন্য চিহ্নিত করবে। কম ঝুঁকির পণ্যের ক্ষেত্রে আর শারীরিক পরীক্ষা প্রয়োজন হবে না। এতে সময় ও খরচ দুটোই কমবে।
দ্রুত খালাসে পোস্ট-ক্লিয়ারেন্স অডিট
পণ্য দ্রুত ছাড়ের জন্য পোস্ট-ক্লিয়ারেন্স অডিটের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। এতে বন্দর থেকে দ্রুত পণ্য ছাড় করা সম্ভব হবে এবং পরে প্রয়োজন অনুযায়ী যাচাই করা যাবে।
পরীক্ষা প্রক্রিয়ায় দেরি কমাতে নতুন ব্যবস্থা
একাধিক সরকারি সংস্থার পরীক্ষার কারণে পণ্য খালাসে দেরি হয় বলে তিনি স্বীকার করেন। এ সমস্যা দূর করতে পরীক্ষার প্রক্রিয়া সহজ করা হচ্ছে। নতুন ব্যবস্থায় সপ্তাহের সাত দিনই ল্যাবরেটরির নমুনা সংগ্রহ করা হবে। আমদানিকারকেরা সরকারি ল্যাবের পাশাপাশি স্বীকৃত দেশীয় ও বিদেশি ল্যাব ব্যবহার করতে পারবেন।
অনুগত করদাতা ও এএইওদের সুবিধা
নিয়ম মেনে চলা করদাতারা দ্রুত খালাসের সুবিধা পাবেন। অনুমোদিত অর্থনৈতিক অপারেটর বা এএইওদের জন্য থাকবে অতিরিক্ত সুবিধা, যেমন গ্রিন চ্যানেলে পণ্য ছাড় ও পোস্ট-ক্লিয়ারেন্স অডিট। তিনি জানান, সোমবার নতুন বা উন্নত মানের তিনটি প্রতিষ্ঠানকে এএইও লাইসেন্স দেওয়া হবে।
আগাম ঘোষণা ও প্রযুক্তি সংযোগ জোরদার
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, পণ্য আসার আগেই ঘোষণা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও তা পুরোপুরি কাজে লাগানো হচ্ছে না। কেন অনেক ক্ষেত্রে পণ্য বন্দরে পৌঁছানোর পর ঘোষণা দেওয়া হয়, সে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আগাম ঘোষণা দিলে সময় সাশ্রয় হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পণ্য খালাস আরও দ্রুত করতে এনবিআরের আসাইকুডা সিস্টেমকে বন্দর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার কাজ চলছে।
ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো ও বন্ড অটোমেশন
ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থার মাধ্যমে ইতিমধ্যে প্রায় নয় লাখ সনদ, লাইসেন্স ও অনুমতি ইস্যু করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি আবেদন এক ঘণ্টার মধ্যেই নিষ্পত্তি হয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে কাস্টমস বন্ড অটোমেশন পুরোপুরি চালু হওয়ায় কাগজপত্রের ঝামেলা কমেছে। বন্ড কমিশনারেটের ভিড় কমেছে এবং এখন দূরবর্তীভাবে বন্ডসংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন করা যাচ্ছে।
মূল্য নির্ধারণে সমন্বয় ও নজরদারি
এনবিআর বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে বাণিজ্যিক ইনভয়েসের তথ্য শুল্ক ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এতে পণ্যের মূল্য নিয়ে বিরোধ কমবে এবং কম বা বেশি মূল্য দেখানোর প্রবণতা নজরদারিতে রাখা সহজ হবে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের ক্যাটালগ সংগ্রহ করা হচ্ছে, যাতে আমদানি পণ্যের সঠিক মূল্য নির্ধারণ ও অনিয়ম শনাক্ত করা যায়।
রাজস্ব কাঠামোর পরিবর্তন ও নিরাপত্তা ভূমিকা
রাজস্ব প্রবণতা নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে আমদানি শুল্কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থেকে সরে আসছে। আয়কর ও মূল্য সংযোজন করের অবদান বাড়ছে। টেকসই উন্নয়ন ও আয় পুনর্বণ্টনের জন্য এই দুই খাত শক্তিশালী করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, শুল্ক প্রশাসন শুধু রাজস্ব আদায়েই নয়, অর্থপাচার প্রতিরোধ এবং ক্ষতিকর আমদানি ঠেকাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তথ্য প্রকাশ ও কর ফেরত
প্রশ্নের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, আমদানি তথ্য গোপনীয় নয়। করদাতার পরিচয় সুরক্ষিত রেখে এসব তথ্য এনবিআরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।
তিনি বলেন, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় ভ্যাট ফেরত দেওয়া শুরু হয়েছে। একইভাবে আয়কর ফেরতও পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করতে কাজ চলছে, যাতে কর কর্মকর্তা ও করদাতার সরাসরি যোগাযোগ কমে আসে।
প্রয়োজনীয় পণ্যে শুল্ক হ্রাস
শুল্ক নীতি প্রসঙ্গে তিনি জানান, জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ফলমূল, খেজুর, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ ও চালসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর শুল্ক কমানো হয়েছে। রাজস্বের চেয়ে সাধারণ মানুষের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















