প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা থেকেই সাইকেলে চড়ে শহরের অলিগলি, বনপ্রান্ত আর জলধারার পাশে ঘুরে বেড়ান জিমি ট্যান। তিনি কোনো নীতিনির্ধারক নন, বিজ্ঞানীও নন। পেশায় খণ্ডকালীন ডেলিভারি রাইডার ও নিরাপত্তাকর্মী। তবু গত পাঁচ বছরে পরিবেশসংক্রান্ত জনঅভিযোগ সামলানো সরকারি দপ্তরগুলোর কাছে তার নাম পরিচিত হয়ে উঠেছে।
সপ্তাহে নিয়মিত সাইকেল চালিয়ে তিনি খেয়াল করেন গাছপালা, বনাঞ্চল, জলাভূমি আর বন্যপ্রাণীর ওপর মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাব। কোথাও স্বচ্ছ কাচে ধাক্কা খেয়ে পাখির মৃত্যু, কোথাও নির্মাণস্থল থেকে ছড়িয়ে পড়া পলিমাটি। চোখে পড়া প্রতিটি ঘটনা তিনি নথিভুক্ত করেন, ছবি ও ভিডিও তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানান।
ডেইরি ফার্ম রোডের বাসস্টপে স্বচ্ছ কাচে ধাক্কা খেয়ে একাধিক পাখির মৃত্যুর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। বাসস্টপটি বুকিত তিমাহ প্রাকৃতিক সংরক্ষণ এলাকার প্রান্তে অবস্থিত, যেখানে পরিণত বন ও নানা প্রজাতির পাখির আবাস। স্বচ্ছ কাচ পাখিদের জন্য ছিল অদৃশ্য মৃত্যুফাঁদ। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই পরিবহন কর্তৃপক্ষ ও উদ্যান বিভাগ কাচে ঝাপসা দাগ ও চিহ্ন বসানোর উদ্যোগ নেয়, যাতে পাখিরা বাধা চিনতে পারে।
এর আগেও তার তৎপরতায় ফল মিলেছে। তেঙ্গাহ এলাকার এক নির্মাণস্থলে পলিমাটি ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা তুলে ধরার পর সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে ত্রুটি সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে জানা যায়, অননুমোদিত মাটিকাজ ও পর্যবেক্ষণ নীতিমালা না মানায় ওই প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাও করা হয়েছে।
তবে এই সাফল্যের আনন্দের মাঝেও জিমি ট্যানের মনে রয়ে গেছে আক্ষেপ। তার হৃদয়ের কাছের অনেক বনাঞ্চল এখনও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায়। তেঙ্গাহ বন রক্ষার দাবি জানিয়ে তিনি মনে করেন, ত্রুটি সংশোধনের পাশাপাশি বন উজাড় পুরোপুরি থামানো গেলে বন্যপ্রাণীর ক্ষতি অনেক কমত। বুকিত বাতোক ও জুরংয়ের মাঝের বিস্তীর্ণ তেঙ্গাহ এলাকা বহু বছর ধরেই নতুন নগর পরিকল্পনার অংশ, কিন্তু সংরক্ষণবিদদের মতে এই বনাঞ্চল দ্বীপের বিভিন্ন বনের মধ্যে প্রাণীদের চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ সবুজ করিডর।
এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধেই তিনি অনলাইন স্বাক্ষর অভিযান শুরু করেন। তেঙ্গাহ বনের অন্তত একাংশ সংরক্ষণ এবং বুকিত বাতোক পাহাড়ি পার্ক রক্ষার দাবিতে তার উদ্যোগে হাজার হাজার মানুষ যুক্ত হন। তবু সব দাবি পূরণ হয়নি। কিছু জমি এখনও আবাসনের জন্য নির্ধারিত। এতে হতাশা এলেও তিনি মনে করেন, জনসচেতনতা তৈরিই ছিল সবচেয়ে বড় অর্জন।
এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে তিনি বনভ্রমণের আয়োজন করেন। নিজের অন্তর্মুখী স্বভাব পেছনে ফেলে আগ্রহীদের নিয়ে গাইডেড হাঁটায় বের হন। সেখান থেকেই তৈরি হয় প্রকৃতিপ্রেমীদের একটি যোগাযোগমাধ্যম গোষ্ঠী। পরে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন ও খামার বিষয়ক একটি কমিউনিটি গড়ে তোলেন, যেখানে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণী মৃত্যু এবং সংরক্ষণসংক্রান্ত নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এই জায়গাটি অনেকের কাছে পরিবেশ হারানোর বেদনা ভাগ করে নেওয়ার নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠেছে।
তবে সমালোচনাও এসেছে। কেউ কেউ তাকে বনেই গিয়ে বসবাসের পরামর্শ দিয়েছে, কেউ আবার ঝামেলা সৃষ্টিকারী বলে আখ্যা দিয়েছে। এসব মন্তব্য কষ্ট দিলেও তিনি সেগুলোকে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখেন। প্রশ্নের মুখে পড়ে তিনি বনমাটির স্বাভাবিক মাটি ও নির্মাণস্থলের ক্ষতিকর পলির পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে শিখেছেন। তার মতে, এতে যুক্তি আরও শাণিত হয়েছে।
ভবিষ্যতে তার নজর জালান বাহারের আশপাশের বনাঞ্চলের দিকে, যেখানে নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এই উন্নয়ন হলে দ্বীপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত করিডর ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা। তবু তিনি লক্ষ্য করছেন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে আগ্রহ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। একসময় যা ছিল সীমিত গোষ্ঠীর বিষয়, এখন তা মূলধারার আলোচনায় জায়গা করে নিচ্ছে।
এই বিশ্বাস নিয়েই জিমি ট্যান সাইকেল আর পায়ে হেঁটে শহর চষে বেড়াতে চান। যতদিন সম্ভব, তিনি চান বন আর বন্যপ্রাণীর কথা যেন দেখা ও শোনা যায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















