ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশটি আরও স্পষ্টভাবে বাস্তববাদী ও বাজারমুখী অর্থনৈতিক পথে এগিয়ে যাওয়ার সংকেত দিল। পার্টির নতুন সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন তো লাম। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শাসক দলটি জানিয়ে দিল, আদর্শিক কঠোরতার বদলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বাস্তবসম্মত নীতিই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।
চীনের মতো ভিয়েতনামও একদলীয় শাসন ব্যবস্থায় পরিচালিত দেশ। তবে তো লাম দায়িত্ব নেওয়ার পরই দল ও সরকারের ভেতরে সংস্কারের অঙ্গীকার করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর কথা বলেছেন, যা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার বাইরে যাওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে আশ্বাস
রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ছে—এমন সমালোচনার জবাবে তো লাম স্পষ্ট করে বলেছেন, এসব প্রতিষ্ঠানই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নেতৃত্ব দেবে। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের সামনে তিনি জানান, কৌশলগত খাতগুলোর নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের হাতেই থাকবে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোই সেখানে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।

দশ শতাংশ প্রবৃদ্ধির উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য
ভিয়েতনামের নতুন নেতৃত্ব বার্ষিক দশ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠার দৃঢ় সংকল্পকে তুলে ধরে। গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ভিয়েতনাম ধারাবাহিক উন্নয়নের পথে রয়েছে, আর সেই ধারাকে আরও গতিশীল করাই এখন প্রধান উদ্দেশ্য।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক
এক সময়ের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ইতিহাস পেছনে ফেলে ভিয়েতনাম ও যুক্তরাষ্ট্র এখন ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক অংশীদার। ষাটের দশক থেকে উনিশ শ পঁচাত্তর সাল পর্যন্ত চলা যুদ্ধের স্মৃতি ছাপিয়ে দুই দেশ সহযোগিতার পথে হাঁটছে। চীনের বাইরে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজতে থাকা মার্কিন ব্যবসায়ীদের কাছে ভিয়েতনাম ফিলিপাইনের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠেছে। এই সহযোগিতা উভয় দেশের জন্যই লাভজনক প্রমাণিত হয়েছে।
দলীয় টানাপোড়েন ও স্থিতিশীলতার প্রশ্ন

এই রূপান্তর প্রক্রিয়া সহজ ছিল না। পার্টির ভেতরে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, দুর্নীতির অভিযোগে শুদ্ধি অভিযান এবং বেসরকারি খাতের ওপর কঠোরতা দেখা গিয়েছিল। তবে সেই সময়কাল দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, কঠোরতা যদি আরও দীর্ঘ হতো, তাহলে দেশের বিনিয়োগ ভাবমূর্তি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত। শেষ পর্যন্ত পার্টির নিয়ন্ত্রণে স্থিতিশীলতা বজায় থাকায় ভিয়েতনাম বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আঞ্চলিক ভূমিকা
ভিয়েতনাম আঞ্চলিক পর্যায়ে চীনের প্রভাব মোকাবিলায় দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের পেছনেও বড় কারণ হলো, হ্যানয় আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষায় চীনের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। অনেক বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম ফিলিপাইনের চেয়েও বেশি কার্যকর চ্যালেঞ্জার হিসেবে উঠে এসেছে।
একদলীয় শাসন ও বাজার অর্থনীতির বিরল মডেল

ভিয়েতনাম ও চীন—এই দুই দেশই এমন উদাহরণ, যেখানে কমিউনিস্ট পার্টি রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রেখে বাজারভিত্তিক অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়েছে। বিশ্বে খুব কম কমিউনিস্ট দলই এই সমন্বয় সফলভাবে করতে পেরেছে। সমালোচকদের কেউ কেউ বলেন, ভিয়েতনামের কমিউনিজম এখন কেবল নামেই আছে। তবে বাস্তবে দেশটিতে কমিউনিস্ট পার্টিই একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি, জনগণের সামনে বিকল্প কোনো রাজনৈতিক পথ নেই।
আসিয়ানে ভিয়েতনামের উত্থান
এক সময় চীন ও ভিয়েতনাম থেকে ছড়িয়ে পড়া কমিউনিজম ঠেকাতেই আসিয়ান গঠিত হয়েছিল। আজ সেই আসিয়ানের মধ্যেই ভিয়েতনাম একটি শীর্ষস্থানীয় বাজার অর্থনীতির দেশ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। ইতিহাসের এই বৈপরীত্য অনেকের কাছেই বিস্ময়কর, আবার কারও কাছে তা ভিয়েতনামের বাস্তববাদী রাজনৈতিক কৌশলের স্বাভাবিক ফল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















