করাচির ঐতিহাসিক ফ্রেয়ার হল যেন একদিনের জন্য ফিরে গিয়েছিল শতাব্দী পেছনে। সময়ের সাক্ষী হয়ে থাকা একশটিরও বেশি প্রাচীন ও দুর্লভ গাড়ির প্রদর্শনীতে রোববার সকাল থেকেই ভিড় জমাতে থাকেন গাড়িপ্রেমী থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শনার্থীরা। উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের সূচনাকাল পর্যন্ত বিস্তৃত এসব গাড়ি করাচির মানুষকে নিয়ে যায় ইতিহাসের এক জীবন্ত জাদুঘরে।
একদিনের জীবন্ত জাদুঘর
পাকিস্তানের প্রথম ও একমাত্র অনলাইন প্রাচীন গাড়ির জাদুঘর উদ্যোগের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই প্রদর্শনী ছিল চতুর্থ বার্ষিক আয়োজন। উদ্যোক্তাদের ভাষায়, দেশে কোনো স্থায়ী ক্লাসিক গাড়ির জাদুঘর না থাকায় এমন প্রদর্শনী একদিনের জন্য হলেও মানুষকে বাস্তব অভিজ্ঞতা দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। ঐতিহাসিক স্থাপনার ভেতরে সাজানো সারি সারি গাড়ি যেন দর্শনার্থীদের জন্য এক অনন্য সময়ভ্রমণের অনুভূতি তৈরি করে।

উদ্যোক্তার স্বপ্ন ও প্রত্যাশা
প্রদর্শনী উপলক্ষে আয়োজক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা শোয়াইব কোরেশি বলেন, পাকিস্তানে স্থায়ী কোনো প্রাচীন গাড়ির জাদুঘর না থাকাটা তাঁর দীর্ঘদিনের আক্ষেপ। সরকারি বা বেসরকারি সহযোগিতা এবং পর্যাপ্ত জায়গা পেলে করাচিতেই দেশের প্রথম স্থায়ী গাড়ির জাদুঘর গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন তিনি, যেখানে সারা বছর মানুষ এই ঐতিহ্য উপভোগ করতে পারবে। তাঁর মতে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশ ও বিশ্বের সামনে পাকিস্তানে থাকা অমূল্য ঐতিহাসিক গাড়িগুলো তুলে ধরাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে গাড়িপ্রীতি
এই প্রদর্শনী ছিল সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এবং বিনা মূল্যের। শিশু, তরুণ থেকে শুরু করে প্রবীণ দর্শনার্থীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো ছিল। অনেকেই পরিবার নিয়ে এসে এসব গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছেন, গল্প শুনেছেন, ইতিহাস জানার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। প্রতিদিনের রাস্তায় যেসব গাড়ি আর দেখা যায় না, সেগুলোকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ ছিল সবার জন্যই এক বিশেষ অভিজ্ঞতা।

একশ দশটি গাড়ি, একশ বছরের ইতিহাস
প্রদর্শনীতে মোট একশ দশটি প্রাচীন গাড়ি স্থান পায়। এর মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী গাড়িটির বয়স ছিল বিশ বছর, আর সবচেয়ে পুরোনো গাড়িটি ছিল একশ দুই বছরের। এসব গাড়ির মধ্যে দেশের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা কয়েকটি যান বিশেষভাবে নজর কাড়ে।
স্বাধীনতার সাক্ষী ঐতিহাসিক গাড়ি
সবচেয়ে আলোচিত গাড়িগুলোর একটি ছিল উনিশশো চব্বিশ সালের রোলস রয়েস সিলভার ঘোস্ট, যা বাহাওয়ালপুরের নবাবের মালিকানাধীন ছিল। এই গাড়িতেই উনিশশো সাতচল্লিশ সালের চৌদ্দই আগস্ট স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করতে গভর্নর হাউসে যান কায়েদে আজম ও লর্ড মাউন্টব্যাটেন। ইতিহাসের এমন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকা গাড়িটি দর্শনার্থীদের গভীর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যবহৃত রাজকীয় যান

প্রদর্শনীতে আরও ছিল উনিশশো বাহান্ন সালের ক্যাডিলাক ফ্লিটউড লিমুজিন, যা পাকিস্তানের প্রথম রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা ব্যবহার করতেন। এই গাড়িটি সেই সময়ের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হয়।
শতবর্ষী গাড়ির ঝলক
দুটি ঠিক একশ বছর বয়সী গাড়িও প্রদর্শনীতে স্থান পায়, যা পাকিস্তানের প্রাচীনতম গাড়িগুলোর মধ্যে অন্যতম। উনিশশো ছাব্বিশ সালের শেভ্রোলেট সুপিরিয়র এবং অস্টিন সেভেন চামি দর্শকদের দেখিয়েছে এক শতাব্দী আগে গাড়ির নকশা ও প্রযুক্তি কেমন ছিল।
দুর্লভতার অনন্য উদাহরণ
প্রদর্শনীতে থাকা দুর্লভ গাড়িগুলোর মধ্যে উনিশশো একচল্লিশ সালের ক্যাডিলাক সেডানেট কুপ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই ধরনের আরেকটি গাড়ি ছিল পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মালিকানায়, যা গভর্নর জেনারেল হিসেবে তাঁর প্রথম গাড়ি ছিল। সেই উনিশশো সাতচল্লিশ সালের ক্যাডিলাক লিমুজিন বর্তমানে করাচিতে তাঁর সমাধিতে জনসাধারণের প্রদর্শনের জন্য রাখা আছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















