ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিতে ফেরার এক বছর পর বৈশ্বিক বাণিজ্য মানচিত্রে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। অনেকেই ভেবেছিলেন, এই সময়টা চীনের জন্য কঠিন হবে। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে উল্টো। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়লেও বেইজিং অন্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করে ২০২৫ সালে রেকর্ড বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে।

রয়টার্সের বিশ্লেষণ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত মিত্রদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের টানাপোড়েনের সুযোগে চীন কানাডা, ভারতসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের দিকে মনোযোগ বাড়িয়েছে। এর ফল হিসেবে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি গত বছর ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারের রেকর্ড বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে। একই সঙ্গে মাসিক বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ পৌঁছেছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১০০ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক পরিসরে চীনা মুদ্রা ইউয়ানের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের চার দিনের চীন সফর শুরু হচ্ছে। ২০১৮ সালের পর এটি কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বেইজিং সফর। বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর চীনের বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বিস্তৃত করার পথ খুলে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র অনিশ্চিত, চীন ‘স্থির অংশীদার’
অর্থনীতিবিদদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির ফলে যুক্তরাষ্ট্র এখন অনেক দেশের কাছে কম পূর্বানুমেয়। সেই শূন্যস্থান পূরণে চীন নিজেকে ‘নির্ভরযোগ্য ও স্থিতিশীল’ অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করছে। বোস্টন কলেজের অধ্যাপক আলেকসান্দার টোমিচ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি জটিল হয়ে উঠছে, তত বেশি জায়গা খুলছে চীনের জন্য।
এই প্রবণতা শুধু যুক্তরাজ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চলতি মাসে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বেইজিং সফরে গিয়ে চীনের সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। কার্নি চীনকে ‘আরও পূর্বানুমেয় ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার’ হিসেবে বর্ণনা করেন। একই সঙ্গে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা একটি বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছেছে, যার লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা কমানো।
যুক্তরাষ্ট্র–চীন সম্পর্ক গত কয়েক বছর ধরেই উত্তপ্ত। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প ফের ক্ষমতায় আসার পর সেই উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ১০০ শতাংশের বেশি করেছিল। পরে সাময়িক সমঝোতা হলেও বেইজিং তখনই বিকল্প বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর কৌশল নেয়।
এর ফল স্পষ্ট। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি কমেছে ২০ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে আফ্রিকায় রপ্তানি বেড়েছে ২৫.৮ শতাংশ, লাতিন আমেরিকায় ৭.৪ শতাংশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ১৩.৪ শতাংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে ৮.৪ শতাংশ।

ইউয়ান, বাজার ও সতর্কতার বার্তা
বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যেও চীনের অর্থনীতি সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০২৫ সালে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। অভ্যন্তরীণ ভোগ দুর্বলতা ও আবাসন খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংকট সত্ত্বেও এই অর্জনকে বেইজিং বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে। বিদেশি বিনিয়োগ টানতে টেলিকম, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বাজার প্রবেশাধিকার বাড়ানো হয়েছে।
ডিসেম্বরে চীনের বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ দাঁড়ায় ১০০.১ বিলিয়ন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পৌঁছেছে দশ বছরের সর্বোচ্চ ৩.৩৬ ট্রিলিয়ন ডলারে। শেয়ারবাজারেও চীন শক্ত অবস্থান নিয়েছে। গত এক বছরে সাংহাই সূচক ২৭ শতাংশ বেড়েছে, যা মার্কিন শেয়ারবাজারের চেয়েও ভালো।
ডলারের আকর্ষণ কমে যাওয়ায় চীন ইউয়ানের বৈশ্বিক ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা জোরদার করেছে। বর্তমানে চীনের অর্ধেকের বেশি সীমান্তপারের লেনদেন ইউয়ানে নিষ্পত্তি হচ্ছে। বিদেশে দেওয়া ব্যাংক ঋণের প্রায় অর্ধেকও এখন রেনমিনবিতে।
তবে এই নতুন বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনীতির মাঝেও সতর্কতার সুর রয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক প্যাট্রিসিয়া কিম মনে করিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অনাস্থা মানেই চীনের ওপর পূর্ণ আস্থা নয়। অনেক দেশ এখনও চীনের অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল, বাণিজ্যনীতি এবং আঞ্চলিক বিরোধ নিয়ে উদ্বিগ্ন।
তবু বর্তমান বাস্তবতায় একটি বিষয় স্পষ্ট—ট্রাম্প প্রশাসনের অনিশ্চিত নীতির সুযোগে চীন নিজেকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এই ‘চীনের দিকে ঝোঁক’ এখন আর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নয়, বরং চলমান বাস্তবতা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















