ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে স্বাক্ষরিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ভারতের রপ্তানি খাতে বড় মোড় আনতে চলেছে। চুক্তি কার্যকর হলেই ইউরোপের প্রায় ৯.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য ও সেবা বাজারে ভারতের ৯০.৭ শতাংশ রপ্তানি পণ্য তাৎক্ষণিকভাবে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। এই সিদ্ধান্তকে ভারত–ইইউ সম্পর্কের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একে ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, ২৭টি ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে একই দিনে এই চুক্তি স্বাক্ষর একটি সুখকর কাকতালীয় ঘটনা। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েনও বলেছেন, ভারত ও ইউরোপ আজ ইতিহাস তৈরি করেছে।

রপ্তানিতে বড় সুবিধা, শ্রমনির্ভর খাতে জোর
এই চুক্তির ফলে বস্ত্র, চামড়া, চা, কফি, মসলা, খেলনা, রত্ন ও গয়না, সামুদ্রিক পণ্যসহ শ্রমনির্ভর খাতগুলো সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। এসব খাতের পণ্য এখন ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর তুলনায় আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল জানিয়েছেন, এই চুক্তি ভারত ও ইউরোপ—দু’পক্ষের জন্যই লাভজনক। তার মতে, ভারতের শ্রমনির্ভর শিল্প বড় বাজারে প্রবেশাধিকার পাবে, আর ইউরোপ পাবে ভারতের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে উচ্চপ্রযুক্তি খাতে সুযোগ। চুক্তির আওতায় ভারতের মোট রপ্তানির প্রায় ৯৯ শতাংশ এবং ইউরোপের রপ্তানির প্রায় ৯৭ শতাংশ পণ্য ও সেবা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
বিশেষ করে সামুদ্রিক পণ্যের প্রায় ৯৪ শতাংশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। পাশাপাশি পোশাক, হোম ডেকর, ক্রীড়া সামগ্রী, রেলওয়ে যন্ত্রাংশ, চামড়া ও জুতাশিল্পও এই সুবিধার আওতায় আসছে।

কৃষি, কার্বন কর ও ভবিষ্যৎ পথচলা
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ভারতের কৃষি ও খাদ্যপণ্যে থাকা গড় ৩৬ শতাংশ শুল্ক ধীরে ধীরে কমানো হবে। প্রিমিয়াম ওয়াইনের শুল্ক ১৫০ শতাংশ থেকে কমে ২০ শতাংশে নামবে। বিয়ার, অলিভ অয়েল, ভোজ্য তেল, চকলেট ও বিস্কুটের মতো পণ্যের শুল্কও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস বা বাতিল হবে।
তবে উভয় পক্ষই সংবেদনশীল কৃষিপণ্যকে এই চুক্তির বাইরে রেখেছে। ইউরোপ গরু, চিনি, চাল, দুগ্ধজাত পণ্যসহ কিছু পণ্যে বর্তমান শুল্ক বহাল রাখবে। একইভাবে ভারতও দুগ্ধ, শস্য, পোলট্রি ও সয়ামিল খাতে সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে।
ইউরোপের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম বা কার্বন কর নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বাণিজ্য সচিব রাজেশ আগরওয়াল জানিয়েছেন, এই বিষয়ে একটি প্রযুক্তিগত সংলাপ চালু করা হয়েছে, যাতে ভারতীয় শিল্পের বাজার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা যায়। ভবিষ্যতে ভারতের কার্বন ট্রেডিং ব্যবস্থা ইউরোপের কাঠামোর সঙ্গে সমন্বিত করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।

আইনি যাচাই শেষে চলতি বছরের মধ্যেই এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হওয়ার আশা করা হচ্ছে। এতে প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলারের ভারতীয় রপ্তানি পণ্য সরাসরি শুল্কমুক্তভাবে ইউরোপে প্রবেশ করবে। বদলে ভারতও ইউরোপীয় পণ্যের জন্য ধাপে ধাপে শুল্ক কমাতে সম্মত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি শুধু বাণিজ্য নয়—কৃষক আয়, গ্রামীণ জীবিকা, শিল্প বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ভারতের অবস্থান আরও শক্ত করবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















