যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন অভিযানের সময় সহিংস ঘটনার পর প্রশাসনের দেওয়া বয়ান একের পর এক প্রমাণে ভেঙে পড়ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মিনিয়াপোলিসে দুই মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনাসহ অন্তত ছয়টি ঘটনায় ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ অভিবাসন কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সঙ্গে ভিডিও ও নথিভিত্তিক প্রমাণের স্পষ্ট অসঙ্গতি রয়েছে। এতে করে ফেডারেল সংস্থাগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের সদিচ্ছা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
এই মাসে মিনিয়াপোলিসে নিহত রেনে গুড ও অ্যালেক্স প্রেটির ক্ষেত্রে প্রশাসন দ্রুত তাদের ‘আক্রমণকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে গুলিবর্ষণকে ন্যায্য বলে দাবি করে। কিন্তু পরে প্রকাশিত ভিডিও ও অন্যান্য প্রমাণ সেই বর্ণনার সঙ্গে মিল খায়নি। বরং দেখা গেছে, ঘটনাগুলোর বাস্তবতা সরকারি বক্তব্যের চেয়ে অনেক জটিল।

ভিডিওতে ভিন্ন চিত্র
রয়টার্সের পর্যালোচনায় অন্তর্ভুক্ত ছয়টি ঘটনার মধ্যে বেশ কয়েকটিতে আদালতে উপস্থাপিত ভিডিও বা নথি সরকারি বক্তব্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে। মিনেসোটার একটি ঘটনায় অভিবাসন কর্মকর্তারা দাবি করেছিলেন, অ্যালেক্স প্রেটি বন্দুক হাতে এগিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু যাচাইকৃত ভিডিওতে দেখা যায়, তার হাতে ছিল একটি মোবাইল ফোন। গুলির ঠিক আগে একজন কর্মকর্তা তার শরীর থেকে বন্দুকটি সরিয়ে নেন। ওই বন্দুক বহনের বৈধ অনুমতিও ছিল তার।
একইভাবে ৭ জানুয়ারি মিনিয়াপোলিসে রেনে গুড নিহত হওয়ার পর স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা দপ্তর দাবি করে, তিনি গাড়িকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। এমনকি তাকে ‘ঘরোয়া সন্ত্রাসী’ বলা হয়। তবে একাধিক কোণ থেকে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়িটি কর্মকর্তাদের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিল। গাড়ি সরাসরি আঘাত করেছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবু ওই সময় গুলি চালানো হয়।
আরেক ঘটনায় জানুয়ারি মাসে মিনেসোটায় এক ব্যক্তিকে ধাওয়া করার সময় ভুল পরিচয়ের কারণে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। আদালতে প্রকাশিত এফবিআইয়ের হলফনামায় বলা হয়, কর্মকর্তারা ভুল লাইসেন্স প্লেট স্ক্যান করে ভিন্ন একজনকে ধাওয়া করেছিলেন। এই তথ্য স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা দপ্তরের প্রাথমিক বক্তব্যে ছিল না।
আদালতের কড়া মন্তব্য
টেক্সাসের একটি আটক কেন্দ্রে কিউবান অভিবাসী জেরালদো লুনাস কাম্পোসের মৃত্যুর ঘটনাতেও বয়ান বদলের অভিযোগ উঠেছে। প্রথমে স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা দপ্তর বলেছিল, তিনি চিকিৎসাজনিত সমস্যায় মারা গেছেন। পরে ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে উঠে আসে, ঘটনাটি শ্বাসরোধজনিত হত্যাকাণ্ড। শেষ পর্যন্ত কাউন্টি মেডিক্যাল এক্সামিনারের প্রতিবেদনে মৃত্যুটিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
শিকাগোতে অভিবাসন কর্মকর্তাদের বলপ্রয়োগ সীমিত করার মামলায় এক ফেডারেল বিচারক সরকারের ‘ব্যাপক ভুল তথ্য’ নিয়ে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন। তার মন্তব্য, ছোট ছোট অসঙ্গতি জমতে জমতে এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে সরকারের বক্তব্য বিশ্বাস করাই কঠিন।
অন্য এক ঘটনায় শিকাগোর উপশহরে এক মার্কিন নাগরিক মারিমার মার্তিনেজ গুলিবিদ্ধ হন। প্রশাসন দাবি করেছিল, তিনি সশস্ত্র ছিলেন এবং কর্মকর্তাদের আঘাত করেছিলেন। পরে বডিক্যামের ফুটেজে দেখা যায়, তার অস্ত্র ব্যাগেই ছিল। শেষ পর্যন্ত সরকার নিজেই তার বিরুদ্ধে মামলা তুলে নেয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, তারা কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত তথ্য দিচ্ছে। তবে সাবেক স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা দপ্তরের মুখপাত্র ডেভিড ল্যাপানের মতে, শুরু থেকেই বয়ান নিয়ন্ত্রণের এই চেষ্টা আগের ফেডারেল রীতির স্পষ্ট বিচ্যুতি।
এই ঘটনাগুলো মিলিয়ে একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—অভিবাসন অভিযানে সহিংসতার পর সরকারি বক্তব্য কি সত্য উদঘাটনের চেয়ে বয়ান রক্ষায় বেশি আগ্রহী? প্রমাণ যত সামনে আসছে, সেই প্রশ্ন তত জোরালো হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















