০৩:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
জাপান থেকে ব্রাজিল—ভোটের রায়ে টালমাটাল হতে পারে বাজার, নির্বাচনের বছরে বাড়ছে অনিশ্চয়তা এশিয়ার শেয়ারবাজারে ধস, ধাতুর দামে বড় পতনে অস্থির বিশ্ববাজার রাশিয়া বৈশ্বিক সংঘাত চায় না: মেদভেদেভ বিশ্ববাজারের চাহিদায় চাঙা এশিয়ার কারখানা, রপ্তানিতে ফিরছে গতি ইতিহাস গড়ল গ্র্যামি: স্প্যানিশ ভাষার অ্যালবামে প্রথমবার বর্ষসেরা পুরস্কার জিতলেন ব্যাড বানি হাতিরঝিলে পিকআপের ধাক্কায় প্রাণ গেল এক ভাড়াটিয়ার, চালক পলাতক টি২০ বিশ্বকাপে পাকিস্তান খেলবে, ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামছে না ১৫ ফেব্রুয়ারি চন্দ্র নববর্ষে এআই দখলে ৪৩১ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের ঘোষণা আলিবাবার, চ্যাটবট প্রতিযোগিতা তুঙ্গে বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলায় উদ্বেগজনক বৃদ্ধি, সবচেয়ে ঝুঁকিতে কিশোরী মেয়েরা এক ধাক্কায় সোনার দাম কমল ভরিতে ছয় হাজার পাঁচশো নব্বই টাকা

বরফের রাজনীতির নতুন যুদ্ধ: আর্কটিক কেন বিশ্বশক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে

বিশ্ব রাজনীতির উত্তপ্ত মানচিত্রে আবারও ফিরে এসেছে বরফে ঢাকা আর্কটিক। সাম্প্রতিক সময়ে গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী আগ্রহ এই অঞ্চলকে নতুন করে বৈশ্বিক কূটনীতির কেন্দ্রে এনে দিয়েছে। ডেনমার্কের অধীন এই ভূখণ্ডে ইউরোপীয় দেশগুলোর সেনা তৎপরতা বেড়েছে, ন্যাটোও আকাশ ও জলসীমা নজরদারিতে নতুন উদ্যোগ ভাবছে। এমন প্রেক্ষাপটে সাংবাদিক ও যুদ্ধসংবাদদাতা কেনেথ রোজেনের গ্রন্থ ‘পোলার ওয়ার’ আর্কটিকের ভবিষ্যৎ বুঝতে এক গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হয়ে উঠেছে।

আর্কটিক কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত কৌশলগত। রাশিয়া থেকে ছোড়া পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের সম্ভাব্য উড্ডয়নপথের নিচেই এই দ্বীপ। ট্রাম্পের যুক্তি, ইউরোপ এই অঞ্চল রক্ষা করতে অক্ষম। তবে রোজেনের বিশ্লেষণে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র। তাঁর মতে, আর্কটিকে প্রকৃত প্রতিযোগিতা বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্র বহুদিন ধরে প্রস্তুতিতে পিছিয়ে রয়েছে।

The whiskey war is over! Denmark and Canada already have a land border -  news

সীমান্তহীন এক ভূগোল

আর্কটিকের স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই। কেউ বলেন এটি আর্কটিক বৃত্তের ওপরে সব অঞ্চল, কেউ আবার জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সরে যাওয়া তুন্দ্রার সীমাকে মানদণ্ড ধরেন। এই অনিশ্চয়তাই অঞ্চলটিকে করেছে এক ধরনের সীমান্তবর্তী ভূখণ্ড, যেখানে সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিরোধ নতুন নয়। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তর-পশ্চিম নৌপথ নিয়ে মতবিরোধ কিংবা ডেনমার্ক ও কানাডার দীর্ঘদিনের তথাকথিত হুইস্কি যুদ্ধ তার উদাহরণ।

বরফ গলছে, প্রতিযোগিতা বাড়ছে

বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে বরফ গলে নতুন নৌপথ তৈরি হচ্ছে, যা বাণিজ্য ও সামরিক কৌশলে নতুন সম্ভাবনা আনছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ইউরোপে সামরিক প্রতিযোগিতা বেড়েছে, যার বড় অংশ জুড়ে আছে আর্কটিক অঞ্চল। রাশিয়ার সাবমেরিন ও যুদ্ধবিমান, আলাস্কার কাছাকাছি মহড়া, সবই এই বাস্তবতার অংশ। একই সঙ্গে চীন নিজেকে নিকট-আর্কটিক রাষ্ট্র ঘোষণা করে অর্থনৈতিক ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়িয়েছে।

What to know about the US military's Pituffik Space Base in Greenland

যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বল প্রস্তুতি

গ্রিনল্যান্ডের পিটুফিক মহাকাশ ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হলেও অবকাঠামোগত ভাঙনের মুখে। গলতে থাকা পারমাফ্রস্টের ওপর নির্মিত স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে নরওয়ের আইসব্রেকার জাহাজের সঙ্গে অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে। অভিজ্ঞ নরওয়েজিয়ান নাবিকদের তুলনায় মার্কিন নাবিকদের মানসিক চাপও চোখে পড়ার মতো।

রাশিয়ার এগিয়ে থাকা

রোজেনের মতে, আর্কটিকে রাশিয়া অনেক এগিয়ে। সোভিয়েত আমলের ঘাঁটি আধুনিকায়ন, বিশাল আইসব্রেকার বহর ও ঠান্ডা পরিবেশে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাদের শক্তি বাড়িয়েছে। এই অঞ্চলে অন্য শক্তিগুলোকে পেছনে ফেলে তারা কার্যত নেতৃত্ব দিচ্ছে।

U.S. Navy Conducts Submarine Drills in Arctic

কঠিন ভূখণ্ড, অনিবার্য সহযোগিতা

আর্কটিকে বসবাসই কঠিন, যুদ্ধ তো আরও কঠিন। স্যাটেলাইট যোগাযোগে সমস্যা, চরম ঠান্ডা, মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে এখানে একা কোনো শক্তির সফল হওয়া কঠিন। রোজেনের পর্যবেক্ষণ, যুক্তরাষ্ট্র নরওয়ের মতো ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর যতটা নির্ভরশীল, উল্টোটা ততটা নয়।

ভবিষ্যতের ইঙ্গিত

আর্কটিক নিয়ে সরাসরি যুদ্ধের সম্ভাবনা কম হলেও, অন্য কোনো সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে এই অঞ্চলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা সেই সতর্কবার্তাই দেয়। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, সাবমেরিন ঘাঁটি ও ইউরোপের উত্তর সীমান্ত হিসেবে আর্কটিকের গুরুত্ব বাড়ছেই। এই বাস্তবতায়, বরফের এই কঠিন ভূখণ্ডে টিকে থাকতে হলে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় শক্তি।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

জাপান থেকে ব্রাজিল—ভোটের রায়ে টালমাটাল হতে পারে বাজার, নির্বাচনের বছরে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

বরফের রাজনীতির নতুন যুদ্ধ: আর্কটিক কেন বিশ্বশক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে

০২:০৪:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বিশ্ব রাজনীতির উত্তপ্ত মানচিত্রে আবারও ফিরে এসেছে বরফে ঢাকা আর্কটিক। সাম্প্রতিক সময়ে গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী আগ্রহ এই অঞ্চলকে নতুন করে বৈশ্বিক কূটনীতির কেন্দ্রে এনে দিয়েছে। ডেনমার্কের অধীন এই ভূখণ্ডে ইউরোপীয় দেশগুলোর সেনা তৎপরতা বেড়েছে, ন্যাটোও আকাশ ও জলসীমা নজরদারিতে নতুন উদ্যোগ ভাবছে। এমন প্রেক্ষাপটে সাংবাদিক ও যুদ্ধসংবাদদাতা কেনেথ রোজেনের গ্রন্থ ‘পোলার ওয়ার’ আর্কটিকের ভবিষ্যৎ বুঝতে এক গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হয়ে উঠেছে।

আর্কটিক কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত কৌশলগত। রাশিয়া থেকে ছোড়া পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের সম্ভাব্য উড্ডয়নপথের নিচেই এই দ্বীপ। ট্রাম্পের যুক্তি, ইউরোপ এই অঞ্চল রক্ষা করতে অক্ষম। তবে রোজেনের বিশ্লেষণে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র। তাঁর মতে, আর্কটিকে প্রকৃত প্রতিযোগিতা বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্র বহুদিন ধরে প্রস্তুতিতে পিছিয়ে রয়েছে।

The whiskey war is over! Denmark and Canada already have a land border -  news

সীমান্তহীন এক ভূগোল

আর্কটিকের স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই। কেউ বলেন এটি আর্কটিক বৃত্তের ওপরে সব অঞ্চল, কেউ আবার জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সরে যাওয়া তুন্দ্রার সীমাকে মানদণ্ড ধরেন। এই অনিশ্চয়তাই অঞ্চলটিকে করেছে এক ধরনের সীমান্তবর্তী ভূখণ্ড, যেখানে সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিরোধ নতুন নয়। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তর-পশ্চিম নৌপথ নিয়ে মতবিরোধ কিংবা ডেনমার্ক ও কানাডার দীর্ঘদিনের তথাকথিত হুইস্কি যুদ্ধ তার উদাহরণ।

বরফ গলছে, প্রতিযোগিতা বাড়ছে

বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে বরফ গলে নতুন নৌপথ তৈরি হচ্ছে, যা বাণিজ্য ও সামরিক কৌশলে নতুন সম্ভাবনা আনছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ইউরোপে সামরিক প্রতিযোগিতা বেড়েছে, যার বড় অংশ জুড়ে আছে আর্কটিক অঞ্চল। রাশিয়ার সাবমেরিন ও যুদ্ধবিমান, আলাস্কার কাছাকাছি মহড়া, সবই এই বাস্তবতার অংশ। একই সঙ্গে চীন নিজেকে নিকট-আর্কটিক রাষ্ট্র ঘোষণা করে অর্থনৈতিক ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়িয়েছে।

What to know about the US military's Pituffik Space Base in Greenland

যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বল প্রস্তুতি

গ্রিনল্যান্ডের পিটুফিক মহাকাশ ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হলেও অবকাঠামোগত ভাঙনের মুখে। গলতে থাকা পারমাফ্রস্টের ওপর নির্মিত স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে নরওয়ের আইসব্রেকার জাহাজের সঙ্গে অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে। অভিজ্ঞ নরওয়েজিয়ান নাবিকদের তুলনায় মার্কিন নাবিকদের মানসিক চাপও চোখে পড়ার মতো।

রাশিয়ার এগিয়ে থাকা

রোজেনের মতে, আর্কটিকে রাশিয়া অনেক এগিয়ে। সোভিয়েত আমলের ঘাঁটি আধুনিকায়ন, বিশাল আইসব্রেকার বহর ও ঠান্ডা পরিবেশে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাদের শক্তি বাড়িয়েছে। এই অঞ্চলে অন্য শক্তিগুলোকে পেছনে ফেলে তারা কার্যত নেতৃত্ব দিচ্ছে।

U.S. Navy Conducts Submarine Drills in Arctic

কঠিন ভূখণ্ড, অনিবার্য সহযোগিতা

আর্কটিকে বসবাসই কঠিন, যুদ্ধ তো আরও কঠিন। স্যাটেলাইট যোগাযোগে সমস্যা, চরম ঠান্ডা, মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে এখানে একা কোনো শক্তির সফল হওয়া কঠিন। রোজেনের পর্যবেক্ষণ, যুক্তরাষ্ট্র নরওয়ের মতো ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর যতটা নির্ভরশীল, উল্টোটা ততটা নয়।

ভবিষ্যতের ইঙ্গিত

আর্কটিক নিয়ে সরাসরি যুদ্ধের সম্ভাবনা কম হলেও, অন্য কোনো সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে এই অঞ্চলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা সেই সতর্কবার্তাই দেয়। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, সাবমেরিন ঘাঁটি ও ইউরোপের উত্তর সীমান্ত হিসেবে আর্কটিকের গুরুত্ব বাড়ছেই। এই বাস্তবতায়, বরফের এই কঠিন ভূখণ্ডে টিকে থাকতে হলে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় শক্তি।