ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের জন্য সময়টা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। গত দুই বছরে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের মিত্র শক্তিগুলো সামরিক আঘাতে দুর্বল হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের টানা বারো দিনের বোমা হামলা। সর্বশেষ ধাক্কা আসে অর্থনৈতিক ধস ঘিরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ থেকে, যা দ্রুতই সরকার পতনের দাবিতে রূপ নেয়। এক সময় মনে হচ্ছিল আন্দোলনকারীরাই এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পরে নেমে আসে রাষ্ট্রের নির্মম দমন অভিযান।
মৃতের সংখ্যা কেন গুরুত্বপূর্ণ
কোনো শাসন ব্যবস্থা কতটা আতঙ্কিত, তা অনেক সময় বোঝা যায় তারা বিক্ষোভের জবাবে কতটা সহিংসতা ব্যবহার করছে তা দেখে। নিহত মানুষের সংখ্যা নির্ধারণ শুধু রাজনৈতিক শক্তির মাপকাঠি নয়, বরং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য ও জরুরি। তবে যুদ্ধ বা অভ্যন্তরীণ সংঘাতে প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ সব সময়ই কঠিন। সরকার সাধারণত নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি কম দেখায় এবং বিরোধীরা সংখ্যা বাড়িয়ে তুলে ধরে জনমত তৈরি করতে চায়। ইরানের বর্তমান শাসন ব্যবস্থা ইতিহাসে দুই ধরনের কৌশলই ব্যবহার করেছে।
বিপ্লব থেকে বর্তমান সংকট
উনিশশো আঠাত্তর থেকে উনিশশো উনআশির বিপ্লবে, যা শাহের পতন ঘটায়, নিহতের সংখ্যা নিয়ে তীব্র মতপার্থক্য দেখা যায়। সরকার যেখানে অল্প সংখ্যার কথা বলেছিল, বিরোধীরা সেখানে শত শত মৃত্যুর দাবি তোলে। পরে ইসলামি সরকারের এক কমিশন নির্দিষ্ট সংখ্যা দিলেও সর্বোচ্চ নেতা কয়েক দশ হাজার শহীদের কথা প্রচার করেন।
আজ পরিস্থিতি উল্টো। সাম্প্রতিক বিক্ষোভ শুরু হয় মুদ্রার পতন ও মূল্যস্ফীতি ঘিরে। প্রথমে সহিংসতা সীমিত থাকলেও জানুয়ারির শুরুতে ইন্টারনেট বন্ধের পর সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। জানুয়ারির একুশ তারিখে সরকার মৃতের সংখ্যা তিন হাজারের কিছু বেশি বলে জানায়, যার মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও রয়েছে বলে দাবি করা হয়।
বিভিন্ন হিসাবের বিস্তর ফারাক
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমের হিসাব সরকারি সংখ্যার সঙ্গে তীব্রভাবে ভিন্ন। কোথাও নিহতের সংখ্যা কয়েক হাজার, আবার কোথাও কয়েক দশ হাজার পর্যন্ত বলা হচ্ছে। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, শাসনব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়লে সহিংসতার মাত্রা বেড়ে যায়। দুই হাজার নয় সালের বিক্ষোভে নিহত হয়েছিলেন কয়েক ডজন মানুষ, আর দুই হাজার বাইশ সালের নারী স্বাধীনতা আন্দোলনে মৃতের সংখ্যা ছিল কয়েক শ। সেই তুলনায় এবারের ঘটনা ভিন্ন মাত্রার ইঙ্গিত দেয়।
দেশজুড়ে ভয়ের চিত্র
বিভিন্ন শহরের গণকবর, মরদেহে ভরা মর্গ এবং নিখোঁজ মানুষের খবর পাওয়া যাচ্ছে। আহতের সংখ্যাও কয়েক লাখ পর্যন্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। চিকিৎসকদের বর্ণনায় চোখে গুলি লেগে অন্ধ হয়ে যাওয়া বহু বিক্ষোভকারীর কথা উঠে এসেছে। গ্রামীণ অঞ্চল ও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে, যেখানে তথ্য পৌঁছানো কঠিন।
শেষ পর্যন্ত যে প্রশ্ন
চূড়ান্ত সংখ্যা যাই হোক, ইতিমধ্যেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে টিকে থাকার জন্য রাষ্ট্র নিরস্ত্র নাগরিকদের বিরুদ্ধে অর্ধশতাব্দীর মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে থাকতে পারে। মৃতের হিসাব তাই শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং একটি জাতির ভয়, প্রতিরোধ ও ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















