ইরানে সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান এবং কঠোর দমনপীড়নে হাজারো মানুষের মৃত্যুর পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—কীভাবে রাজনৈতিকভাবে ইসলামি শাসনব্যবস্থার মুখোমুখি হওয়া সম্ভব। একই সময়ে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতার জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে বলে আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তা এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। ফলে ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথরেখা নিয়ে নতুন বিতর্ক সামনে এসেছে।
শাসন পরিবর্তন নাকি নেতৃত্ব পরিবর্তন
বিশ্ব রাজনীতিতে সরাসরি শাসন পরিবর্তনের বদলে নেতৃত্ব পরিবর্তনের ধারণা গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু ইরানের বিশেষ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে যেখানে এই দুই কৌশল একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠান বহাল থাকলে রাষ্ট্র পরিচালনায় বড় কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। একইভাবে এই প্রতিষ্ঠান সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংঘাতমুখী নীতি থেকেও সরে আসার সম্ভাবনা কম।
দীর্ঘ চার দশকের অচলাবস্থা
ইসলামি বিপ্লবের পর গত প্রায় অর্ধশতকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চাপ, সমঝোতা ও প্রণোদনা প্রয়োগ করা হলেও মৌলিক পরিবর্তন দেখা যায়নি। শাসনব্যবস্থা কখনও নমনীয়তার ইঙ্গিত দিলেও তা কৌশলগত বিরতি ছাড়া কিছু নয়। কারণ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে দুটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা পাশাপাশি সক্রিয়—একদিকে প্রচলিত রাষ্ট্র, অন্যদিকে ধর্মীয় অভিভাবকত্বভিত্তিক শাসন। একটির কার্যক্রম অন্যটির জন্য অকার্যকারিতা তৈরি করে, ফলে স্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হয়।
সংঘাতের ঐতিহাসিক শিকড়
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর জনগণের ভোটভিত্তিক বৈধতা ও ধর্মীয় বৈধতার মধ্যে এক নাজুক সমঝোতা গড়ে ওঠে। এই দ্বৈত বৈধতা রক্ষায় রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রের পাশাপাশি ধর্মীয় আমলাতন্ত্র তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে স্থাপন করা হয়। এর মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, বৈশ্বিক আদর্শিক অবস্থানও গ্রহণ করে, যা পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে স্থায়ী সংঘাতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
পরিবর্তনের শর্ত নতুন সংবিধান
এই কাঠামো ভাঙতে হলে কেবল নেতৃত্ব পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নতুন সংবিধান ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। তবে তা বিদেশি চাপ বা অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমঝোতায় সম্ভব নয়। দরকার জাতীয় পুনর্মিলন, মুক্ত ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং প্রতিনিধিত্বশীল সাংবিধানিক পরিষদ গঠন।
বিভক্ত বিরোধী শক্তির ঐক্যের প্রয়োজন
দমনপীড়নের পরও বিরোধী শক্তি এখনও বিভক্ত। ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাতে হলে নতুন ধরনের ঐক্য গড়ে তোলা জরুরি। অতীতের প্রতিদ্বন্দ্বীদেরও একই লক্ষ্যে একত্র হতে হবে—গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের জন্য। নির্বাসিত রাজপরিবারের উত্তরসূরি এবং দীর্ঘদিন গৃহবন্দী বিরোধী নেতৃত্ব—এই দুই প্রতীকের সমন্বয় সামরিক ও আন্তর্জাতিক মহলে আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
নতুন ইরানের সম্ভাবনা
ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা ও জনগণের ভোটাধিকারকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত জাতীয় জোট গড়ে উঠলে পরিবর্তনের গতি তৈরি হতে পারে। এমন সমন্বিত উদ্যোগই ইরানকে দীর্ঘস্থায়ী সংকট থেকে বের করে আনার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















