জরুরি প্রয়োজনে নগদ টাকার জন্য বহু মালয়েশিয়ানের কাছে স্বর্ণ বন্ধক রাখা একটি পরিচিত উপায়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যআয়ের পরিবারগুলোর জন্য এই ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সুরক্ষা হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণের দামে তীব্র ওঠানামা সেই নিরাপত্তা ভেঙে দিয়েছে। ফলে বছরের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সময়—চীনা নববর্ষ ও রমজানকে সামনে রেখে—বন্ধকী দোকানগুলোতে তৈরি হয়েছে নগদ অর্থের সংকট।
পরিবারের স্মৃতিচিহ্ন থেকেও মিলছে না টাকা
আমিনাহ শরিফের পরিবারের স্বর্ণের ব্রেসলেটটি ছিল বহু বছরের পুরোনো, দাদীর উপহার এবং কঠিন সময়ের জন্য সঞ্চিত নিরাপত্তা। দুই সন্তানের এই গৃহিণীর প্রয়োজন ছিল প্রায় দুই হাজার রিঙ্গিত—পরিবারের একমাত্র গাড়ি মেরামত, রমজানের আগে বাজার করা এবং সন্তানদের ঈদের পোশাক কেনার জন্য।
জানুয়ারির শেষ দিকে তিনি উত্তর পারলিস রাজ্যের আরাউ শহরের একের পর এক বন্ধকী দোকানে গিয়েও কোনো টাকা পাননি। একাধিক দোকান জানিয়ে দেয়, তাদের কাছে নতুন ঋণ দেওয়ার মতো অর্থ নেই।
দেশজুড়ে বাড়ছে একই অভিজ্ঞতা
শুধু আমিনাহ নন, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। স্বর্ণের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোয় স্বর্ণনির্ভর ঋণব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক বন্ধকী প্রতিষ্ঠান নতুন গ্রাহকদের ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে যখন উৎসবের আগে পরিবারগুলোর খরচ বেড়ে যায়।
অনেকের জন্য স্বর্ণ বন্ধক রাখা কোনো বিনিয়োগ কৌশল নয়; বরং গাড়ি মেরামত, চিকিৎসা ব্যয় বা স্কুল ফি দেওয়ার মতো দৈনন্দিন জরুরি প্রয়োজন মেটানোর সহজ উপায়। কিন্তু দামের অস্থিরতা সেই ব্যবস্থাকে অচল করে দিচ্ছে।
চিকিৎসার টাকা জোগাড়েও অপেক্ষা
সেলাঙ্গরে ৩৯ বছর বয়সী স্কুলকর্মী জাকারিয়া আহমদ একটি চিকিৎসা প্রক্রিয়ার খরচ জোগাড় করতে ১০ গ্রাম স্বর্ণ নিয়ে দুটি বন্ধকী প্রতিষ্ঠানে যান। তিনি সর্বোচ্চ ঋণ পাওয়ার আশা করেছিলেন, কিন্তু তাকে অপেক্ষা করতে বলা হয়। তিন দিন পরও তিনি কোনো ফোন পাননি।
স্বর্ণের দামের উল্লম্ফন ও বৈশ্বিক প্রভাব
মালয়েশিয়ায় স্বর্ণের দাম প্রতি গ্রাম প্রায় ৬১০ রিঙ্গিত থেকে বেড়ে ৭৬০ রিঙ্গিতের কাছাকাছি পৌঁছে পরে কিছুটা কমে প্রায় ৬৭০ রিঙ্গিতে নেমেছে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নিরাপদ সম্পদে ঝোঁক এবং বিনিয়োগকারীদের স্বর্ণভিত্তিক তহবিলে বিনিয়োগ বৃদ্ধিই এই উত্থানের প্রধান কারণ।
ঋণ পুনঃনবায়নের চাপ
দাম বাড়লে অনেক গ্রাহক একই স্বর্ণের বিপরীতে নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণ শোধ করেন এবং অতিরিক্ত নগদ তুলে নেন। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ওভারল্যাপিং’। এর ফলে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দ্রুত বিপুল পরিমাণ নগদ বেরিয়ে যায়, যা তারল্য সংকটকে আরও তীব্র করে।
প্রতিষ্ঠানগুলোও পড়েছে চাপে
জাতীয় ডাকসেবা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত স্বর্ণভিত্তিক অর্থায়ন কেন্দ্রসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বন্ধকী সেবায় একই চাপ দেখা যাচ্ছে। স্বর্ণের দাম বাড়ায় কাগজে-কলমে ঋণের পরিমাণ বাড়লেও সুদ ও সংরক্ষণ ফি থেকে আয় আসে ধীরে, অথচ নগদ অর্থ দ্রুত বেরিয়ে যায়—ফলে তারল্য সমস্যা থেকেই যায়।
সেলাঙ্গরের একটি শাখায় গ্রাহকদের জানিয়ে নোটিশ টাঙানো হয়েছে যে অর্থ শেষ হয়ে যাওয়ায় নতুন স্বর্ণ বন্ধক নেওয়া হচ্ছে না। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানে মাসিক প্রায় এক শতাংশ হারে সুদ নেওয়া হয়।
উৎসবের আগে অনিশ্চয়তা
চীনা নববর্ষ ও রমজানের মতো বড় উৎসবের আগে যখন পরিবারের খরচ বেড়ে যায়, তখনই এই নগদ সংকট সাধারণ মানুষের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। স্বর্ণ দীর্ঘদিন ধরে যাদের আর্থিক ভরসা ছিল, তাদের অনেকেই এখন সেই ভরসা হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















