এপস্টিন নথির বিস্তার ও ব্রিটেনে প্রভাব
জেফ্রি এপস্টিনকে ঘিরে প্রকাশিত নথির প্রভাব এখন আন্তর্জাতিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে। নরওয়ের রাজপরিবার থেকে শুরু করে ফরাসি প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীরা এর জালে জড়িয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে ব্রিটেনে। প্রিন্স অ্যান্ড্রুর পুরনো বিতর্কের পর এবার নতুন তথ্য সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের কেন্দ্রে আঘাত হেনেছে। এতে চাপে পড়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তার পদত্যাগ ত্বরান্বিত হতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ম্যান্ডেলসনের নিয়োগ ও বিতর্কের সূচনা
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের শেষ দিকে। তখন প্রধানমন্ত্রী স্টারমার সাবেক প্রভাবশালী লেবার নেতা ও টনি ব্লেয়ারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেন। নিয়োগের সময় স্টারমার তাকে অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তি হিসেবে প্রশংসা করেছিলেন।
কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। সেপ্টেম্বরে প্রকাশ পায়, ম্যান্ডেলসনের সঙ্গে জেফ্রি এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এমনকি তিনি এপস্টিনকে নিজের ‘সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ বলেও উল্লেখ করেছিলেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর স্টারমার তাকে পদ থেকে সরিয়ে দিতে বাধ্য হন। তখন তিনি দাবি করেন, সম্পর্কের গভীরতা সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না। সেই সময় বড় ধরনের রাজনৈতিক ক্ষতি এড়াতে সক্ষম হলেও জানুয়ারিতে প্রকাশিত নতুন নথি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

নতুন নথিতে বিস্ফোরক তথ্য
সাম্প্রতিক নথিতে উঠে এসেছে, ম্যান্ডেলসন মন্ত্রী থাকাকালে গোপন সরকারি নীতির তথ্য এপস্টিনকে জানিয়েছিলেন। এমনকি ব্যাংকারদের বোনাসে কর আরোপের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য চ্যান্সেলরের কাছে তদবির করেছিলেন, যা এপস্টিনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে। আরও জানা গেছে, ২০০৯ সালে এপস্টিন কারামুক্ত হলে ম্যান্ডেলসন সেটিকে ‘মুক্তির দিন’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
এই তথ্য প্রকাশের পর স্টারমারের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। তিনি ক্ষমা চেয়ে এবং দোষ ম্যান্ডেলসনের ওপর চাপিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। ম্যান্ডেলসন দল ও হাউস অব লর্ডস থেকে পদত্যাগ করেন। স্টারমার দাবি করেন, তাকে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল এবং এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্কের প্রকৃতি তিনি যেমন ভেবেছিলেন, বাস্তবে তা ভিন্ন ছিল।
তবে সমালোচকদের মতে, ম্যান্ডেলসনের এপস্টিন-সংযোগ ২০১৯ সাল থেকেই জনসমক্ষে ছিল। অতীতে একাধিক কেলেঙ্কারির কারণে ম্যান্ডেলসনের সুনাম প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। ফলে তাকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্টারমারের রাজনৈতিক বিচারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
মরগান ম্যাকসুইনি ও অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার রাজনীতি
এই নিয়োগের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল স্টারমারের চিফ অব স্টাফ মরগান ম্যাকসুইনির। ম্যান্ডেলসনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ম্যাকসুইনি সরকারে প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন। তিনিই ম্যান্ডেলসনের নিয়োগে জোর দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। অবশেষে দায় স্বীকার করে তিনি পদত্যাগ করেন।
স্টারমার ম্যাকসুইনিকে দলের জন্য অপরিহার্য বলে বর্ণনা করেছিলেন। ম্যাকসুইনির মূল লক্ষ্য ছিল দলের বামপন্থি অংশকে দুর্বল করা এবং নিউ লেবার ধাঁচে দলকে ফিরিয়ে আনা। দলীয় গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সফল হলেও শাসনকার্যে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হয়েছে বর্তমান নেতৃত্ব।

নেতৃত্ব সংকট ও নির্বাচনী ঝুঁকি
২০২৪ সালে নির্বাচনে জয়ের পরও স্টারমার নিজেকে শক্তিশালী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। দল ও সাধারণ মানুষের অনেকেই স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছেন না তিনি কোন রাজনৈতিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন। তার নেতৃত্বকে অনেক সময় অন্যদের প্রভাবাধীন বলেও চিত্রিত করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক একটি উপনির্বাচন ঘিরেও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীকে প্রার্থী হতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্টারমারের বিরুদ্ধে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের আশঙ্কাই ফুটে উঠছে।
আরও বড় শঙ্কা হলো, ঐ আসনে লেবারের পরাজয়। দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হলেও সাম্প্রতিক জনমত জরিপে কট্টর ডানপন্থি রিফর্ম ইউকে এগিয়ে রয়েছে। পরাজয় হলে স্টারমারের ওপর পদত্যাগের চাপ বাড়তে পারে। সামনে স্থানীয় নির্বাচনেও লেবারের ভরাডুবির পূর্বাভাস রয়েছে।

রাজনৈতিক বিচারে প্রশ্ন
স্টারমারের পুরো মেয়াদজুড়েই তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দেরিতে পদক্ষেপ নেওয়া, জনবল নির্বাচনে ভুল এবং নীতিগত দ্বিধা তার নেতৃত্বকে দুর্বল করেছে। এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশের এই সংকটে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতায় আসতে গিয়ে তিনি এমন উপদেষ্টাদের ওপর নির্ভর করেছিলেন যারা দলীয় কৌশলে দক্ষ হলেও সুস্পষ্ট রাজনৈতিক দর্শনে অনুগত ছিলেন না। পর্দার আড়ালের সমঝোতা ও গোপন সমর্থন নেটওয়ার্ক হয়তো তাকে ক্ষমতায় পৌঁছাতে সাহায্য করেছে, কিন্তু এখন সেটিই তার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















