দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে বাস্তুচ্যুত মানুষের তাবুর মাঝখানে বালির ওপর আঁকা অস্থায়ী রিংয়ে একদল কিশোরী বক্সিং অনুশীলনে ব্যস্ত। যুদ্ধের ভয়াবহতা আর অবিরাম বোমাবর্ষণের স্মৃতি ভুলে তারা ঘুষির আঘাতে ঝরাতে চায় জমে থাকা কষ্ট।
যুদ্ধবিধ্বস্ত জীবনে নতুন লড়াই
একসময় গাজা সিটিতে নিজের বক্সিং ক্লাব পরিচালনা করতেন ওসামা আইয়ুব। কিন্তু ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যকার যুদ্ধে বিমান হামলায় তার বাড়ি ও ক্লাব ধ্বংস হয়ে যায়। পরে তিনি আশ্রয় নেন দক্ষিণের খান ইউনিস শহরে। সেখানে হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষের ভিড়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন নিজের ক্রীড়া দক্ষতাকে কাজে লাগাবেন মেয়েদের মানসিক পুনর্বাসনের জন্য।
আইয়ুব বলেন, যুদ্ধের মানসিক চাপ থেকে মেয়েদের কিছুটা স্বস্তি দিতে ক্যাম্পের ভেতরেই প্রশিক্ষণ শুরু করা হয়েছে। তার পেছনে রিংয়ে দাঁড়িয়ে দুই কিশোরী একে অপরের মুখোমুখি, চারপাশে সহপাঠীদের উচ্ছ্বাস। কেউ আবার বালির ওপর ঝোলানো পাঞ্চিং ব্যাগে অনুশীলন করছে।
যুদ্ধের ক্ষত থেকে মুক্তির চেষ্টা
আইয়ুবের ভাষায়, যুদ্ধ ও বোমাবর্ষণে মেয়েরা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে। কেউ পরিবার হারিয়েছে, কেউ প্রিয়জন। তাদের ভেতরে জমে থাকা ব্যথা প্রকাশের একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে বক্সিং।
বর্তমানে তিনি সপ্তাহে তিন দিন ৮ থেকে ১৯ বছর বয়সী ৪৫ জন কিশোরীকে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। এই উদ্যোগ স্থানীয় সম্প্রদায় ও অভিভাবকদের কাছ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে।
স্বপ্ন দেখছে নতুন প্রজন্ম
১৪ বছর বয়সী গাজাল রাদওয়ান ভবিষ্যতে চ্যাম্পিয়ন হতে চায়। সে জানায়, বক্সিং তাকে চরিত্র গঠনে সাহায্য করে, ভেতরের চাপ কমায় এবং একদিন বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে লড়াই করে ফিলিস্তিনের পতাকা বিশ্বমঞ্চে ওড়াতে চায়।
একইভাবে ১৬ বছর বয়সী রিমাস জানায়, যুদ্ধ, ধ্বংস আর বোমাবর্ষণের মাঝেও তারা অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি তার আবেদন—তাদের গ্লাভস ও জুতা দেওয়া হোক। বালির ওপর অনুশীলনের বদলে প্রয়োজন ম্যাট ও পাঞ্চিং ব্যাগ।
অভাবের মধ্যেও অদম্য চেষ্টা
গাজায় নির্মাণসামগ্রীর তীব্র সংকট থাকায় আইয়ুবকে অস্থায়ী কাঠের রিং তৈরি করতে হয়েছে। সেখানে কোনো ম্যাট বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। ইসরায়েলের কঠোর অবরোধের কারণে ক্রীড়া অবকাঠামো পুনর্গঠন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। নিয়মিতভাবে নির্মাণসামগ্রী প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়।
জানুয়ারিতে ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানায়, গাজার যুব ও ক্রীড়া কাউন্সিলের জন্য চীনের দেওয়া কৃত্রিম টার্ফের চালান ইসরায়েল ঢুকতে দেয়নি। যখন ওষুধ, খাদ্য ও জ্বালানির তীব্র সংকট চলছে, তখন ক্রীড়া সরঞ্জাম আরও নিচের অগ্রাধিকার তালিকায় পড়ে থাকে।
সহায়তার আহ্বান
আইয়ুব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন, এসব কিশোরী বক্সারদের সহায়তা করা হোক এবং তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হোক। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে এবং মানসিক সহায়তাও মিলবে।
যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মাঝেও গাজার এই মেয়েরা লড়াই থামায়নি। রিংয়ের প্রতিটি ঘুষিতে তারা যেন জানিয়ে দিচ্ছে—ধ্বংসের মধ্যেও স্বপ্ন দেখা যায়, আর স্বপ্নের জন্য লড়াই করাও সম্ভব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















