মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে ইউরোপীয় নেতাদের কণ্ঠে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এক নতুন বাস্তবতা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী অবস্থানের পর ইউরোপ এখন নিজস্ব প্রতিরক্ষা শক্তি বাড়ানোর পথে দ্রুত হাঁটতে চাইছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন সম্মেলনে বলেন, এমন কিছু সীমারেখা অতিক্রম হয়েছে যা আর আগের অবস্থায় ফেরানো যাবে না।
মিউনিখে উদ্বেগের আবহ
মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন-এ আলোচনার কেন্দ্রে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও ন্যাটোর ভবিষ্যৎ। ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড সংযুক্তির প্রচেষ্টা ইউরোপে গভীর সন্দেহ তৈরি করেছে—ওয়াশিংটন কি সত্যিই ন্যাটোর মাধ্যমে ইউরোপকে আগের মতো সুরক্ষা দেবে?
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বক্তব্যে সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও ন্যাটো, রাশিয়া বা ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেননি। এতে ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি।

ন্যাটোর ভেতরে ‘ইউরোপীয় স্তম্ভ’
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস, ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ন্যাটোর ভেতরে শক্তিশালী ‘ইউরোপীয় স্তম্ভ’ গড়ার অঙ্গীকার করেছেন। তাঁদের বার্তা পরিষ্কার—যুক্তরাষ্ট্র পাশে থাকুক বা দূরে সরে যাক, ইউরোপকে নিজের নিরাপত্তার দায় নিজেকেই নিতে হবে।
মের্ৎস জানিয়েছেন, ইউরোপীয় পারমাণবিক প্রতিরোধ নিয়ে ম্যাক্রোঁর সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে। বর্তমানে ইউরোপে স্বতন্ত্র পারমাণবিক সক্ষমতা কার্যত ফ্রান্সের হাতেই।
বাড়ছে প্রতিরক্ষা ব্যয় ও যৌথ প্রকল্প
ইউক্রেন যুদ্ধ পঞ্চম বছরে পড়তে চলেছে। ইউরোপের পূর্ব সীমান্তে রাশিয়াকে বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ন্যাটো সদস্যরা জিডিপির ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ মূল প্রতিরক্ষায় ব্যয় এবং অতিরিক্ত ১ দশমিক ৫ শতাংশ নিরাপত্তা খাতে বিনিয়োগে সম্মত হয়েছে।

ফন ডার লেয়েন জানান, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যয় প্রায় ৮০ শতাংশ বেড়েছে। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড ও সুইডেন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে যৌথ উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ও আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র উন্নয়নেও একাধিক দেশ একসঙ্গে কাজ শুরু করেছে।
অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ধীরগতি
তবে সবকিছু মসৃণ নয়। ফ্রান্স, জার্মানি ও স্পেনের যৌথ যুদ্ধবিমান প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে কাজের ভাগাভাগি নিয়ে মতবিরোধে আটকে আছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিরক্ষা প্রকল্প কি কেবল ইউরোপীয় কোম্পানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাইরের দেশগুলোকেও সুযোগ দেওয়া হবে—এই প্রশ্নেও বিভক্তি স্পষ্ট।

যুদ্ধের নির্মম স্মরণ
সম্মেলনের জৌলুসের মধ্যেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি তুলে ধরেন যুদ্ধের বাস্তব চিত্র। তিনি জানান, শুধু গত মাসেই ইউক্রেনের ওপর ছয় হাজারের বেশি ড্রোন ও দেড় শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। তাঁর কথায়, অস্ত্রের প্রযুক্তি যত দ্রুত বদলাচ্ছে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তত দ্রুত এগোচ্ছে না।
ইউরোপের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—কথার সঙ্গে কাজের মিল কতটা হবে? যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সত্যিই কি একটি আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে পারবে ইউরোপ?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















