মিউনিখে অনুষ্ঠিত ৬২তম নিরাপত্তা সম্মেলনে ইউরোপের শীর্ষ নেতাদের কণ্ঠে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এক নতুন বাস্তবতা। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত পরিবর্তন ও বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ইউরোপ এখন নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার পথে এগোতে চাইছে। বিশেষ করে জার্মানি ও ফ্রান্সের মধ্যে ইউরোপীয় পারমাণবিক প্রতিরোধ নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার ঘোষণা নতুন কূটনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইউরোপীয় পারমাণবিক প্রতিরোধ নিয়ে বার্লিন-প্যারিস আলোচনা
সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে জার্মানির চ্যান্সেলর Friedrich Merz জানান, তিনি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট Emmanuel Macron–এর সঙ্গে ইউরোপীয় পারমাণবিক প্রতিরোধ নিয়ে গোপন আলোচনা শুরু করেছেন। তিনি বলেন, ইউরোপে ভিন্ন ভিন্ন নিরাপত্তা অঞ্চল তৈরি হতে দেওয়া হবে না এবং সব কিছু ন্যাটোর কাঠামোর মধ্যেই থাকবে।
বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ফ্রান্স। ব্রিটেনের ইইউ ছাড়ার পর এই দায়িত্ব পুরোপুরি প্যারিসের কাঁধে। ফলে ইউরোপীয় নিরাপত্তা প্রশ্নে ফ্রান্সের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

‘একাই চলতে পারবে না যুক্তরাষ্ট্র’
মের্ৎস সতর্ক করে বলেন, পুরনো বৈশ্বিক শৃঙ্খলা কার্যত ভেঙে পড়ছে। বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র একা পথ চলতে পারবে না। তিনি ট্রান্স-আটলান্টিক আস্থার পুনর্গঠনের আহ্বান জানান।
তার ভাষণে স্পষ্ট ছিল, ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায় না, বরং সমতার ভিত্তিতে নতুন করে সম্পর্ক সাজাতে চায়। তবে সেই সঙ্গে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও তারা এখন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
ইউরোপকে ভূরাজনৈতিক শক্তি হওয়ার আহ্বান
প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ বলেন, রাশিয়ার হুমকি শিগগিরই শেষ হচ্ছে না। তাই ইউরোপকে কেবল অর্থনৈতিক জোট হিসেবে নয়, প্রকৃত ভূরাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে হবে। তিনি স্বীকার করেন, ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামো এখনো শীতল যুদ্ধের সময়কার চিন্তাধারার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না।

ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক বাণিজ্য অস্থিরতা এবং প্রতিরক্ষা ঘাটতির মতো একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে ইউরোপ এখন নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং বিকল্প কৌশল নিয়ে ভাবছে।
ট্রাম্প নীতির অভিঘাত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump–এর একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, মিত্র দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপ এবং ন্যাটো জোট নিয়ে প্রশ্ন তোলার ঘটনায় ইউরোপে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমনকি গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের মতো প্রস্তাবও জোট রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।
গত বছর একই সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট JD Vance ইউরোপীয় দেশগুলোর তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। এবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী Marco Rubio তুলনামূলক নরম সুরে কথা বললেও স্বীকার করেছেন, ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্ক এক ‘সংজ্ঞায়িত মুহূর্তে’ দাঁড়িয়ে আছে।

জনমতে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি তলানিতে
ইউরোপের ছয়টি বড় দেশে সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ২০১৬ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে চীন, ইরান বা উত্তর কোরিয়ার তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রকে সমান বা বেশি হুমকি হিসেবে দেখছেন ইউরোপীয়রা। তবে রাশিয়া এখনো শীর্ষ হুমকি হিসেবেই বিবেচিত।
সব মিলিয়ে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন স্পষ্ট করে দিল, ইউরোপ এখন আর আগের মতো একমুখী নির্ভরতার পথে হাঁটতে রাজি নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেই তারা গড়ে তুলতে চায় নতুন, শক্তিশালী ও স্বনির্ভর নিরাপত্তা কাঠামো।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















