সিঙ্গাপুরে কিশোরদের মধ্যে মাদক সেবনের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সন্তানকে উপদেশ দিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া নয়, বরং ছোটবেলা থেকেই নিয়মিত ও বিশ্বাসভিত্তিক কথোপকথনই পারে তাদের ঝুঁকি থেকে দূরে রাখতে।
কমছে বয়স, বাড়ছে উদ্বেগ
সিঙ্গাপুরের কেন্দ্রীয় মাদক দমন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে গ্রেপ্তার হওয়া সবচেয়ে কমবয়সি মাদকসেবীর বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। একই বছরে ২০ বছরের কম বয়সি নতুন মাদকসেবীর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ২২ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৩৪, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১৬৩।
সংস্থার ২০২৫ সালের মাদক পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটিতে সবচেয়ে বেশি অপব্যবহৃত মাদক হলো মেথামফেটামিন, যা “আইস” নামেও পরিচিত। এর পরেই রয়েছে হেরোইন ও গাঁজা। নতুন করে গ্রেপ্তার হওয়া গাঁজাসেবীদের মধ্যে প্রতি ১০ জনে ৬ জনের বয়স ৩০ বছরের নিচে।

পরিবারের ভেতরের নীরব দুশ্চিন্তা
জয়ডেন ট্যান নামে এক কিশোরের গল্প অনেক পরিবারের বাস্তবতার প্রতিফলন। ১২ বছর বয়স পর্যন্ত সে ছিল প্রাণবন্ত ও কথাবার্তায় সরব। কিন্তু মাধ্যমিকে ওঠার পর সে একা থাকতে শুরু করে, বন্ধুদের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যায় এবং প্রায়ই খিটখিটে আচরণ করে।
তার মা জয়েস ট্যান বলেন, প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন এটি কিশোর বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন। কিন্তু খবরের কাগজে কিশোরদের মধ্যে মাদক সেবনের হার বাড়ার কথা পড়ে তার মনে প্রশ্ন জাগে—এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না। তিনি দ্বিধায় পড়ে যান, বিষয়টি নিয়ে কথা বলবেন, নাকি চুপ থাকবেন।

কথোপকথন হোক ধারাবাহিক
কেন্দ্রীয় মাদক দমন সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করা অত্যন্ত জরুরি। সম্পর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা পড়াশোনার মতো বিষয় নিয়ে যেমন কথা বলা হয়, তেমনি মাদক নিয়েও স্বাভাবিক আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, কোনো সমস্যা ঘটার পর একবারের জন্য বকাঝকা করে লাভ নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব কিশোরের বাবা-মা নিয়মিত তাদের সঙ্গে মাদক নিয়ে কথা বলেন, তারা তুলনামূলকভাবে মাদক থেকে দূরে থাকে। ২০২৫ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, ৯৪ দশমিক ২ শতাংশ কিশোর জানিয়েছে, বাবা-মায়ের সঙ্গে মাদক নিয়ে আলোচনা তাদের বিরত থাকতে সহায়তা করেছে।

কীভাবে কথা বলবেন
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোররা এমন এক পর্যায়ে থাকে যখন তারা নিজস্ব পরিচয় গড়ে তোলে এবং সীমা পরীক্ষা করে। তাই তাদের সঙ্গে কথা বলার ধরন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত নির্দেশমূলক বা আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া আলোচনার দরজা বন্ধ করে দেয়।
যদি কোনো কিশোর জিজ্ঞেস করে, “বিদেশে গিয়ে অনেকে গাঁজা খায়, এতে সমস্যা কোথায়?”, তখন তাকে চুপ করিয়ে দিলে সে হয়তো বন্ধু বা অনলাইনের ভরসায় উত্তর খুঁজবে। বরং সম্মানজনকভাবে আলোচনা চালিয়ে যাওয়াই উত্তম।
বিশেষজ্ঞরা আরও পরামর্শ দেন, সন্তানকে না বলতে শেখাতে হবে। বন্ধুরা যদি খাবারের সঙ্গে মাদকজাত কিছু প্রস্তাব করে, তাহলে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করে সরে আসার মানসিক প্রস্তুতি থাকা দরকার।
পর্দার আড়ালের প্রভাব
বর্তমানে অনেক কিশোর প্রথম মাদকের ধারণা পায় সরাসরি নয়, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে। ছোট ভিডিও বা ছবির মাধ্যমে মাদক সেবনকে কখনও নিরীহ, কখনও আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এতে ঝুঁকির দিকগুলো আড়ালেই থেকে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইনে সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তিকর বার্তা হলো—অল্প পরিমাণে নিলে ক্ষতি নেই বা এটি আসক্তিকর নয়। এসব বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, কারণ সেগুলো সহজে শেয়ারযোগ্য ও আকর্ষণীয়ভাবে তৈরি করা হয়। সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা পুরোপুরি গড়ে না ওঠায় কিশোরদের কাছে এগুলো স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে।

তথ্য যাচাইয়ে অভিভাবকের ভূমিকা
সংস্থা জানিয়েছে, তারা অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া মাদকপন্থী প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করছে এবং ভয় দেখিয়ে নয়, বরং শিক্ষার মাধ্যমে তা মোকাবিলার চেষ্টা করছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন অভিভাবকরাই।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, সন্তান যা দেখছে তা নিয়ে নিয়মিত কথা বলুন। কোনো তথ্যের উৎস কী, কেন তা তৈরি করা হয়েছে, বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে একই তথ্য পাওয়া যায় কি না—এসব প্রশ্ন একসঙ্গে খতিয়ে দেখা যেতে পারে। এতে সন্তান ধীরে ধীরে সঠিক ও বিভ্রান্তিকর তথ্য আলাদা করতে শিখবে।
অভিভাবকদের মাদক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হতে হবে না। দরকার একজন বিশ্বস্ত মানুষ হওয়া, যার কাছে সন্তান নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারে এবং সঠিক দিকনির্দেশনা পায়।
এই সময়ে নীরবতা নয়, খোলামেলা সংলাপই হতে পারে কিশোরদের সুরক্ষার সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি।–
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















