ডিজিটাল যুগে হাতে লেখার গুরুত্ব কমে গেছে—এমন ধারণা অনেকের। কিন্তু বাস্তবে পরীক্ষার খাতায় পরিষ্কার ও পাঠযোগ্য হাতের লেখা এখনও বড় পার্থক্য গড়ে দেয়। সিঙ্গাপুরভিত্তিক দৈনিক দ্য স্ট্রেইটস টাইমস–এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ভালো হাতের লেখা শুধু নম্বর বাড়ায় না, মনোযোগ ও তথ্য মনে রাখার ক্ষমতাও উন্নত করে।
শিক্ষকের সতর্কবার্তা থেকেই উদ্যোগ
২০২০ সালে যমজ কন্যাদের শিক্ষক যখন ইভলিন লিমকে জানান, “আপনার সন্তানরা মেধাবী, কিন্তু তাদের লেখা বোঝা যায় না—এ কারণে তারা নম্বর হারাচ্ছে”, তখন বিষয়টি গভীরভাবে নেন তিনি। সে সময় তিনি সরবরাহ ও লজিস্টিক খাতে কাজ করতেন। পরে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে গবেষণা করে ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘জুনিয়র মাইন্ড বক্স’ নামের একটি কেন্দ্র, যেখানে পাঠযোগ্য হাতের লেখা শেখানো হয়।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় ১,৮০০ শিক্ষার্থী এই কোর্সে অংশ নিয়েছে। লিমের মতে, অনেক অভিভাবকের কাছে এটি কোচিংয়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জ্ঞান থাকলেও যদি তা স্পষ্টভাবে লেখা না যায়, তাহলে নম্বর পাওয়া কঠিন।
পরীক্ষায় হাতের লেখার প্রভাব
প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় হাতের লেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় একটি শূন্য যদি ছয়ের মতো দেখায়, বা চার যদি নয়ের মতো লাগে, তাহলে পুরো নম্বর কাটা যেতে পারে। ইংরেজি রচনায় ‘a’ যদি ‘u’-এর মতো হয়, বা অক্ষরের ফাঁকফোকর এলোমেলো হয়, তাতেও নম্বর কমে।
২৫ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন গৃহশিক্ষক কার্তিক জেসন নাইডু জানান, একই মানের দুটি রচনা হলেও যেটি অপাঠ্য, সেটিতে ভুল বোঝাবুঝি বা গুরুত্বপূর্ণ অংশ চোখ এড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। খারাপ হাতের লেখা পড়তে দ্বিগুণ সময় লাগে, কখনও চোখ বিশ্রামও দিতে হয়।
হাতের লেখায় অবচেতন পক্ষপাত
রাইট টু উইন নামের একটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা নিধি গুপ্তার মতে, পরিষ্কার ও গোছানো হাতের লেখা শিক্ষকের মনে অবচেতনভাবে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করে। এতে নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়তে পারে।

মান কমার কারণ
আগে বিদ্যালয়ে লেখার কৌশল ও অক্ষর গঠনের দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। এখন পাঠ্যবস্তুর চাপ বাড়ায় অনুশীলনের বড় অংশ বাড়িতে করতে হয়, যেখানে তদারকি কম। তাছাড়া শিশুরা এখন লেখার চেয়ে পর্দায় স্পর্শ করতে বেশি অভ্যস্ত। মহামারির সময় যারা ঘরে বসে অনলাইন শিক্ষায় অভ্যস্ত হয়েছে, তাদের অনেকেই প্রাথমিক স্তরে এসে লেখায় বেশি সমস্যায় পড়ছে।
কোন বয়সে শুরু ভালো
বিশেষজ্ঞদের মতে, ছয় থেকে নয় বছর বয়স হাতের লেখার অভ্যাস গড়ার সেরা সময়। তবে দেরি হলেও সমস্যা নেই। ১২ বছর বয়সী কিংবা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের হাতের লেখাও সফলভাবে উন্নত করা গেছে।
লিমের প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার্থীরা বড় অংশ। অনেক অভিভাবক পঞ্চম শ্রেণির মাঝামাঝি বা ষষ্ঠ শ্রেণিতে এসে ভর্তি করান। এমনও হয়েছে, একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষা শুরুর আগের দিন তিন ঘণ্টার নিবিড় প্রশিক্ষণ নিয়েছে।

নিয়মিত অনুশীলনই মূল চাবিকাঠি
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতের লেখা উন্নত করতে দীর্ঘ সময় লাগে না। শুরুতে নিয়মিত অনুশীলন ও পুনরাবৃত্তি জরুরি, পরে মাঝে মাঝে নজরদারি করলেই হয়। প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলো নির্দিষ্ট সময়সীমায় ধারাবাহিক ক্লাসের মাধ্যমে অভ্যাস গড়ে তোলে।
শুধু সুন্দর দেখালেই যথেষ্ট নয়
শিক্ষকেরা অক্ষরের গঠন, উপরের-নিচের ভারসাম্য, ফাঁক, সারিবদ্ধতা, ঢাল ও চাপ লক্ষ্য করেন। কোথা থেকে অক্ষর শুরু হচ্ছে, কোন দিকে ঘুরছে—এসবও গুরুত্বপূর্ণ। ভুল স্ট্রোক ভবিষ্যতে লেখায় ক্লান্তি ও অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
পরীক্ষায় দীর্ঘ সময় টানা লিখতে হলে লেখার গতি ও স্বাচ্ছন্দ্য জরুরি। তাই সঠিক ভঙ্গি ও কলম ধরার পদ্ধতিও শেখানো হয়। বামহাতি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে কাগজের কোণ ও কলম ধরার কৌশলে বিশেষ নজর দেওয়া হয়, যাতে কালি ছড়িয়ে না যায়।

চীনা অক্ষর শেখাতেও গুরুত্ব
২০২১ সালে লিম চীনা অক্ষর সঠিক স্ট্রোক ও ক্রম মেনে লেখার জন্য আলাদা ক্লাস চালু করেন। এটি তুলনামূলক কঠিন হলেও কার্যকর বলে জানান তিনি। অনেক শিক্ষার্থী ইংরেজি ও চীনা—দুই ধরনের লেখার প্রশিক্ষণই নেয়।
ফলাফল ও আত্মবিশ্বাস
কয়েক দিনের অনুশীলনেই খাতায় দৃশ্যমান উন্নতি দেখা যায়। অভিভাবকেরা স্বল্প সময়ে পরিবর্তন দেখে বিস্মিত হন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভালো হাতের লেখা মনোযোগ ও তথ্য মনে রাখার ক্ষমতা বাড়ায়।
গ্রাফোলজি বা হস্তাক্ষর বিশ্লেষণে প্রশিক্ষিত নিধি গুপ্তা বলেন, অগোছালো লেখার কারণে অনেক শিশুকে অলস বা বিশৃঙ্খল বলে ভুল ধারণা করা হয়। কিন্তু লেখার বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারে। যখন শিক্ষক পরিষ্কার কাজের প্রশংসা করেন, তখন সেই শিশুর আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যায়।
ডিজিটাল যুগেও হাতের লেখা কেবল অতীতের দক্ষতা নয়। পরীক্ষায় সঠিক মূল্যায়ন, মনোযোগ বৃদ্ধি এবং আত্মবিশ্বাস গঠনে এর প্রভাব স্পষ্ট। তাই পরিষ্কার ও টেকসই লেখার অভ্যাস গড়ে তোলা শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















