মার্চের মাঝামাঝি এক সপ্তাহের স্কুল ছুটি সামনে। পিএসএলই পরীক্ষার্থী সন্তানের অভিভাবকদের মনে তাই একই প্রশ্ন—এ সময়ে কি ছোট্ট পারিবারিক ভ্রমণে যাওয়া উচিত, নাকি পুরো মনোযোগ দেওয়া উচিত পড়াশোনায়?
অনেকেই মনে করেন, বড় পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভ্রমণ নয়। আবার কেউ কেউ ভাবেন, মার্চই হয়তো পরীক্ষার আগে শেষবারের মতো একটু মানসিক বিরতি নেওয়ার সুযোগ। তাহলে সিদ্ধান্ত কীভাবে নেবেন?

সন্তানের স্বভাব-মনোভাবই আসল বিবেচ্য
শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের কাউন্সেলিং প্রতিষ্ঠান মাইন্ডফুল বিয়ারের পরামর্শদাতা সাইমন লি বলেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সন্তানের ব্যক্তিত্ব বোঝা জরুরি। প্রত্যেক শিশুই আলাদা। কেউ কেউ ছুটির পর পড়াশোনায় ফের মন বসাতে হিমশিম খায়, রুটিনে অভ্যস্ত থাকে কিংবা পিছিয়ে পড়ার ভয় প্রবল থাকে। এমন সন্তানদের ক্ষেত্রে দেশে থেকে নিয়ম মেনে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া হয়তো বেশি স্বস্তিদায়ক।
কিন্তু যদি কোনো শিশুর মধ্যে বিরক্তি, ক্লান্তি বা মানসিক অবসাদের লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে মার্চের একটি সংক্ষিপ্ত বিরতি তাকে বড় ধরনের অবসাদ, উদ্বেগ বা পড়াশোনায় অনাগ্রহ থেকে রক্ষা করতে পারে। বছরের মাঝামাঝি যে চাপ তৈরি হয়, তা সামাল দিতেও এই বিরতি সহায়ক হতে পারে।
তবে সাইমন লির মতে, মার্চ মাস কোনোভাবেই পড়াশোনার জন্য ‘শেষ সুযোগ’ নয়। তিনি বলেন, এই সময়টিকে নতুন করে শক্তি সঞ্চয় ও আগের পড়া ঝালিয়ে নেওয়ার পর্যায় হিসেবে দেখা উচিত, অতিরিক্ত নতুন বিষয় শেষ করার দৌড় হিসেবে নয়। অভিভাবকদের প্রশ্ন হওয়া উচিত—ছুটি নিলে ফল খারাপ হবে কি না—এটা নয়; বরং সন্তান কীভাবে শক্তি ও আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়, সেটাই আসল বিবেচনা।

স্বল্প ছুটির ইতিবাচক প্রভাব
রিসেস সাইকোলজি অ্যান্ড কোচিং সেন্টারের কোচ ও কাউন্সেলর অস্টিন লিয়ংও একই মত দেন। তাঁর মতে, ছোট ছুটি মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ও মানসিক সুস্থতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে মন সতেজ হয়, মনোযোগ বাড়ে এবং পরিবারে সম্পর্কও মজবুত হয়।
বিশ্রামহীন নয়, কাজমুক্ত বিরতি
৪৯ বছর বয়সী মেরিলিন টে, যিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ফ্রিল্যান্স এনরিচমেন্ট প্রশিক্ষক এবং তিন সন্তানের মা, নিজ অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছেন স্বল্প ছুটির উপকারিতা। ২০২৫ সালে তাঁর এক সন্তান পিএসএলই এবং বড় সন্তান ও-লেভেল পরীক্ষায় অংশ নেয়। সে বছর জুনের ছুটিতে তিনি পরিবারসহ পাঁচ দিনের জন্য পেনাং ভ্রমণে যান।
মেরিলিন টে মনে করেন, শিশুদের যথেষ্ট বিশ্রাম প্রয়োজন। পাঁচ দিনের বিরতি পড়াশোনায় বড় ক্ষতি করে না; বরং তারা নতুন উদ্যম নিয়ে ফিরে আসে। ভ্রমণের সময় সন্তানদের কোনো পড়ার চাপ দেওয়া হয়নি। পরিবার একসঙ্গে সময় কাটিয়েছে, ঘুরেছে, খেয়েছে, আনন্দ করেছে। আগে থেকেই পরিকল্পনা ও আলোচনা থাকায় সন্তানরাও সময় ব্যবস্থাপনা ঠিকভাবে করতে পেরেছে।
তাঁর মতে, এমন ভ্রমণ পরিবারে বন্ধন আরও দৃঢ় করে।

‘ওয়ার্কিং হলিডে’ ধারণা
অন্যদিকে, কিছু অভিভাবক আশঙ্কা করেন, মার্চের ছুটিতে সন্তান ঢিলেঢালা হয়ে পড়তে পারে। সাইমন লি বলেন, অনেকেই ভাবেন—অন্যরা যদি এই সময় পড়াশোনা করে, তাহলে আমার সন্তান পিছিয়ে যাবে না তো? আবার ছুটির পর পড়ার ছন্দে ফিরতে সমস্যা হবে না তো?
এক্ষেত্রে অস্টিন লিয়ং জোর দেন স্পষ্ট যোগাযোগের ওপর। ভ্রমণে গেলে পড়ার বই বা অনুশীলন খাতা নেওয়া হবে কি না, প্রতিদিন কতটা সময় পড়া হবে—এসব নিয়ে আগে থেকেই বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে বোঝাপড়া থাকা জরুরি।
৫৮ বছর বয়সী সাইরিল লিম, যিনি উপস্থাপক, ছুটিতে গেলে সন্তানের জন্য আগের বছরের প্রশ্নপত্র ও অনুশীলনী বই সঙ্গে রাখেন। তাঁর ছেলে কনর ২০২৬ সালে পিএসএলই দেবে। ২০২৫ সালের ভ্রমণে তিনি প্রতিদিন সকালে জিম ও নাশতার পর প্রায় এক ঘণ্টা ছেলের সঙ্গে পড়াশোনা করতেন। এরপর দিনের বাকি সময় কাটত আনন্দে।
সাইরিল লিমের ভাষায়, পড়াশোনা শরীরচর্চার মতো। একেবারে বন্ধ রাখলে ছন্দ নষ্ট হয়ে যায়। তাই ছোট, নিয়মিত প্রচেষ্টাই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্রাম থেকেই মানসিক দৃঢ়তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্চের ছুটি শুধু শিশুদের জন্য নয়, অভিভাবকদের জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সাইমন লি বলেন, শিশুরা বড়দের আবেগ গভীরভাবে বুঝতে পারে। শান্ত ও মানসিকভাবে সুসংহত অভিভাবক সন্তানের সাফল্যে বড় ভূমিকা রাখে। যখন বাবা-মা বিশ্রাম নেন, সন্তানও নিরাপদ বোধ করে বিশ্রাম নিতে শেখে।
বারো বছর বয়সে শিশুরা শিখতে শুরু করে, বড়রা চাপ কীভাবে সামলায়। ভ্রমণের মতো অভিজ্ঞতা তাদের শেখায়, বিশ্রামও সাফল্যের অংশ। এতে তারা আত্মনিয়ন্ত্রণ, মানসিক দৃঢ়তা এবং পরিবার ও স্বাস্থ্যের গুরুত্ব সম্পর্কে বাস্তব শিক্ষা পায়।
সবশেষে বিশেষজ্ঞদের অভিমত একটাই—পিএসএলইর আগে ভ্রমণে যাওয়া হবে কি না, তার একক কোনো উত্তর নেই। সন্তানের মানসিক অবস্থা, অভ্যাস ও প্রয়োজন বুঝেই নিতে হবে সিদ্ধান্ত। কারণ সাফল্যের পথ শুধু পড়ার টেবিলেই নয়, কখনও কখনও একটু বিরতিতেও লুকিয়ে থাকে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















