কাগজে-কলমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অব পিস’ একটি প্রচলিত আন্তর্জাতিক সংস্থার মতোই দেখায়। এর সনদে আন্তর্জাতিক আইনি সত্তা ঘোষণা করা হয়েছে, বিভিন্ন অঙ্গ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, ভোটের নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সংশোধনের বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতা অস্বাভাবিকভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছে একটি দপ্তর—এবং একজন ব্যক্তির হাতে।
২০২৫ সালের শেষ দিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ প্রস্তাব ২৮০৩ গ্রহণ করে এই বোর্ডকে গাজা সংঘাতের অবসানে একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে স্বাগত জানায়। তখন এটি নিরাপত্তা পরিষদের ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে সমর্থিত দীর্ঘদিনের অস্থায়ী ব্যবস্থাগুলোর ধারাবাহিকতায় আরেকটি বাস্তবসম্মত ও সময়সীমাবদ্ধ উদ্যোগ বলেই মনে হয়েছিল।

কিন্তু জানুয়ারিতে দাভোসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও উচ্চাভিলাষী ও অস্পষ্ট একটি রূপ উন্মোচন করেন। ‘বোর্ড অব পিস’কে একটি নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যার বৈশ্বিক ম্যান্ডেট হবে “সংঘাতে আক্রান্ত বা হুমকির মুখে থাকা এলাকায়” স্থিতিশীলতা জোরদার ও শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠন। ১৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে সদ্য পুনঃনামকরণ করা ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প ইনস্টিটিউট অব পিসে এর প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। উদ্বোধনী বৈঠকের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে গাজার পুনর্গঠন পরিকল্পনা ও একটি স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠন।
বোর্ডের সদস্যপদ কেবল আমন্ত্রণের ভিত্তিতে। ইতিমধ্যে প্রায় ৩০টির মতো দেশ এতে সই করেছে—যার মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান, আর্জেন্টিনা এবং সর্বশেষ ইসরায়েল। বহু ইউরোপীয় সরকার সাংবিধানিক বা নীতিগত উদ্বেগ দেখিয়ে প্রকাশ্যে আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে। কানাডা শুরুতে যোগদানে আগ্রহ দেখালেও দাভোসে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ‘মহাশক্তি’র অর্থনৈতিক জবরদস্তির বিরুদ্ধে মধ্যম শক্তিগুলোর ঐক্যের আহ্বান জানালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই আমন্ত্রণ প্রত্যাহার করেন।
অন্যরা আরও সতর্ক। সিঙ্গাপুর তাদের মধ্যে যারা এখনো যোগদানের বিষয়টি “মূল্যায়ন” করছে। এই শব্দের ভেতরেই রয়েছে কূটনৈতিক সূক্ষ্মতা। কথিত আছে, ভলতেয়ার বলেছিলেন—কূটনীতিকরা “হ্যাঁ” বললে বোঝায় “হয়তো”, “হয়তো” বললে বোঝায় “না”, আর যদি “না” বলে, তবে সে কূটনীতিক নয়।
এই সতর্কতা অমূলক নয়। এটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে যোগদানের আমন্ত্রণ নয়; বরং একটি নতুন ও অনিশ্চিত বিশ্বব্যবস্থার দিকে পদক্ষেপ। অনেক আন্তর্জাতিক আইনবিদের কাছে ট্রাম্পের এই উদ্যোগ বিভ্রান্তিকর। জাতিসংঘ ত্রুটিপূর্ণ, ভঙ্গুর ও অর্থসংকটে জর্জরিত হলেও ১৯৪৫-পরবর্তী ব্যবস্থার সাংবিধানিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেই রয়ে গেছে। ‘বোর্ড অব পিস’ যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু।
নব-রাজতন্ত্রের ছাপ
কাগজে-কলমে বোর্ডটি একটি প্রচলিত আন্তর্জাতিক সংস্থার মতোই। কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতা অস্বাভাবিকভাবে কেন্দ্রীভূত। ট্রাম্পকে উদ্বোধনী চেয়ারম্যান হিসেবে নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বোর্ডের সব সিদ্ধান্তে তাঁর অনুমোদন লাগবে। নির্বাহী বোর্ড তিনি নিয়োগ ও অপসারণ করতে পারবেন। সংশোধনী তিনি নিশ্চিত করবেন। ব্যাখ্যার চূড়ান্ত কর্তৃত্ব তাঁর। উত্তরসূরিও তিনি মনোনীত করবেন। তিনি ইচ্ছামতো সংস্থাটি বিলুপ্ত করতে পারবেন—এবং যেকোনো বেজোড় সংখ্যাবিশিষ্ট বছরের শেষে তাঁর নবায়ন না করলে সংস্থাটি বিলুপ্ত হবে।
সদস্যপদ চেয়ারম্যানের আমন্ত্রণে। এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি অনুদান দিলে মেয়াদসীমা প্রযোজ্য হবে না। অর্থায়ন স্বেচ্ছাভিত্তিক এবং “অন্যান্য উৎস” থেকেও আসতে পারে। নীতিনির্ধারক বিশ্লেষকেরা তুলনা খুঁজেছেন। গাজার ক্ষেত্রে এটি সাবেক যুগোস্লাভিয়া ও তিমোর-লেস্তেতে গঠিত অন্তর্বর্তী প্রশাসনের মতো, যার ঐতিহ্য জাতিসংঘের ট্রাস্টিশিপ ব্যবস্থা ও লীগ অব নেশন্সের ম্যান্ডেট ব্যবস্থায় নিহিত।
কিন্তু বৃহত্তর উচ্চাকাঙ্ক্ষা আরও পুরোনো শাসন মডেলের কথা মনে করায়—ঊনবিংশ শতাব্দীর ‘কনসার্ট অব ইউরোপ’, যেখানে অল্প কয়েকটি শক্তি ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে স্থিতিশীলতা রক্ষা করত, সার্বজনীন আইনের ভিত্তিতে নয়। তবে কনসার্ট ছিল সমমর্যাদার শক্তিগুলোর সমাবেশ। ‘বোর্ড অব পিস’ স্পষ্টতই স্তরবিন্যস্ত।
জাতিসংঘ গড়ে উঠেছিল উদার প্রাতিষ্ঠানিকতার ভিত্তিতে, যেখানে নিয়ম ও সার্বভৌম সমতা ছিল মূলনীতি। এর পাশাপাশি বাস্তববাদ দীর্ঘদিন সহাবস্থান করেছে, যা রাষ্ট্রক্ষমতার প্রাধান্য স্বীকার করে। কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন কিছু—এক ধরনের নব-রাজতন্ত্র, যেখানে কর্তৃত্ব কেন্দ্রীভূত একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির হাতে; যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ও পদ্ধতিগত ভারসাম্যের চেয়ে ব্যক্তিনির্ভর নেতৃত্ব, স্তরবিন্যাস ও লেনদেনভিত্তিক আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
উদার প্রাতিষ্ঠানিকতা নিয়মে আস্থা রাখে—অনেকে বলবেন, সরলভাবে। বাস্তববাদ রাষ্ট্রে আস্থা রাখে—অনেকে বলবেন, নিরাশাভরে। নব-রাজতন্ত্র আমাদের শাসকের ওপর আস্থা রাখতে বলে।

অসন্তোষের বিশ্বায়ন
এটিকে নিছক নাটক বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ। এক বিশ্লেষক একে বলেছেন, “একটি সাম্রাজ্যিক দরবার, যেখানে অনুগত রাষ্ট্রগুলো অর্থ দেয় এবং কমলা সম্রাটের কানে পৌঁছাতে প্রতিযোগিতা করে।” কিন্তু এতে মূল বিষয়টি ধরা পড়ে না।
শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বহু দেশেই ভোটাররা প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। তাদের চোখে এসব প্রতিষ্ঠান দূরবর্তী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং অনুত্তরদায়ী। জনতাবাদী ও কর্তৃত্ববাদী আন্দোলনগুলো দাবি করেছে যে প্রচলিত ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের বদলে এলিটদের সেবা করে। প্রস্তাবিত সমাধান ধীরে ধীরে সংস্কার নয়, বরং দৃঢ় নেতৃত্ব—যদিও তাতে দীর্ঘদিনের নীতি পরিত্যাগ করতে হয়।
‘বোর্ড অব পিস’ সেই ঘরোয়া মনোভাবকে আন্তর্জাতিক কাঠামোয় রূপ দেয়। এর প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, যে প্রতিষ্ঠানগুলো “প্রায়ই ব্যর্থ হয়েছে” সেগুলো থেকে সরে আসার কথা। এটি দ্রুততা ও ফলাফলের প্রতিশ্রুতি দেয়। এই ধারণায় বৈধতা আসে কার্যকারিতা ও প্রবেশাধিকারের ভিত্তিতে, সার্বভৌম সমতা বা জটিল প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে নয়।
সে অর্থে বোর্ডটি বিচ্যুতি নয়, বরং লক্ষণ। দেশে দেশে প্রাতিষ্ঠানিক উদারবাদের প্রতি আস্থা কমলে আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিকতাও প্রশ্নের মুখে পড়বে—এটাই স্বাভাবিক।
জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ কোথায়
জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রতি অন্ধ প্রতিরক্ষা যথেষ্ট নয়। নিরাপত্তা পরিষদ তার স্থায়ী পাঁচ সদস্যের বিশেষাধিকারকে স্থায়ী করে রেখেছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতাকে জমাট বেঁধে রেখেছে। ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও ধীরগতির জলবায়ু সংকটের মাঝে জাতিসংঘ প্রাসঙ্গিকতার লড়াই করছে। আর্থিকভাবে এটি অনুদাননির্ভর, যা অগ্রাধিকার বিকৃত করতে পারে।

তবু বিকল্প প্রস্তাব এলেও জাতিসংঘ টিকে গেছে। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ‘লীগ অব ডেমোক্রেসিস’-এর প্রস্তাব দিয়েছিল। নানা রূপ এসেছে—যোগাযোগ গোষ্ঠী, “ইচ্ছুকদের জোট”, জি-৭, জি-২০, গণতন্ত্র সম্মেলন—যেগুলো বহুপাক্ষিক অচলাবস্থার হতাশা থেকে জন্ম নিয়েছে। কিন্তু কোনোটিই জাতিসংঘকে প্রতিস্থাপন করতে পারেনি। প্রয়োজন হলে বৈধতার জন্য আবার জাতিসংঘেই ফিরে যেতে হয়েছে।
‘বোর্ড অব পিস’ও হয়তো সেই ধারাতেই পড়বে। গাজার ক্ষেত্রে এটি দায়িত্ব বণ্টনের একটি পরিচিত ধারা অনুসরণ করছে। সম্ভাব্য ফল হতে পারে পুনর্গঠনের অর্থায়ন ব্যবস্থা এবং একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠনে কয়েকটি দেশের সমন্বিত উদ্যোগ।
নতুনত্ব রয়েছে এর বৃহত্তর উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও নকশায়। বোর্ডটি জাতিসংঘ ব্যবস্থার ভেতরে নয়; বরং কথার মাধ্যমে নিজেকে বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করছে।
আক্ষরিক না গুরুত্বসহকারে
তাহলে আমরা কীভাবে নেব?
আক্ষরিকভাবে নিলে প্রশ্ন উঠবে—মাত্র তিনটি স্বাক্ষর কি কার্যকারিতা শুরুর জন্য যথেষ্ট? রাষ্ট্রপ্রধান কি আইনসভা অনুমোদন ছাড়া দেশকে বাধ্য করতে পারেন? এই কাঠামো কি সত্যিই একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক সংস্থা সৃষ্টি করে? এর সিদ্ধান্ত কি জাতিসংঘ সনদের বাধ্যবাধকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে?
গুরুত্ব দিয়ে নিলে বোঝা যায় এটি কী ইঙ্গিত করছে—বিদ্যমান নিয়মের প্রতি অস্থিরতা, পর্যালোচনার চেয়ে গতির প্রতি আকর্ষণ, এবং প্রচলিত কাঠামোকে ব্যর্থ মনে হলে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক রূপে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রস্তুতি।
তবু আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যেন ক্ষমতা ও অর্থকেই একমাত্র চালিকাশক্তি ধরে আইন ও নীতিকে অগ্রাহ্য না করি। ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব যাকে বলেছেন “মূল্যভিত্তিক বাস্তববাদ”—মূল নীতিতে অটল থেকে বাস্তবতা স্বীকার করা—সেই মধ্যপথই হতে পারে সমাধান।
![]()
সিঙ্গাপুরের মতো ক্ষুদ্র ও বাণিজ্যনির্ভর রাষ্ট্রের জন্য, যা দীর্ঘদিন নিয়মভিত্তিক শৃঙ্খলার পক্ষে, হিসাবটা সূক্ষ্ম। সম্পৃক্ততা প্রভাবের সুযোগ দিতে পারে; বিরত থাকা নীতিগত অবস্থানকে জোরদার করতে পারে।
দাভোসে প্রধানমন্ত্রী কার্নি যে রূপক ব্যবহার করেছিলেন—যা সিঙ্গাপুরের সাবেক জাতিসংঘ রাষ্ট্রদূত অধ্যাপক এস. জয়কুমারের স্মৃতিকথার শিরোনামও—তা স্মরণীয়: আপনি যদি টেবিলে না থাকেন, তবে হয়তো মেনুতেই থাকবেন।
ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ নিজেকে বৈশ্বিক বিশৃঙ্খলার সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করছে। কিন্তু তিনি যে টেবিল সাজাচ্ছেন তা স্পষ্টতই অসম। সেখানে একজনই মেনু লেখেন এবং পছন্দমতো অর্ডার দেন; বাকিরা নির্দিষ্ট মেনু থেকে বেছে নেন—অথবা অপেক্ষা করেন, কী বা কে পরিবেশিত হয় তা দেখার জন্য।
লেখক: সাইমন চেস্টারম্যান সিঙ্গাপুর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভিড মার্শাল আইন অধ্যাপক এবং এনইউএস কলেজের ডিন।
সাইমন চেস্টারম্যান 



















