ফিলিপাইনের সেবু সিটিতে বিনালিউ ল্যান্ডফিল ধসে ৩৬ জনের মৃত্যু দেশজুড়ে শোক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু এটি আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরে সতর্কবার্তা থাকলেও দুর্বল বাস্তবায়ন, অগ্রাধিকারহীন নীতি এবং বর্জ্য ফেলার ওপর নির্ভরশীল একটি ভঙ্গুর ব্যবস্থাই এমন বিপর্যয়ের পথ তৈরি করেছে।

বিনালিউ ল্যান্ডফিল ধস: কী ঘটেছিল
গত ৮ জানুয়ারি মধ্য ফিলিপাইনের সেবু সিটির বিনালিউ ল্যান্ডফিল হঠাৎ ধসে পড়ে। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু ময়লার স্তূপ—প্লাস্টিক বোতল, পচা খাবার, ভাঙা আসবাব—সবকিছু মিশে তৈরি হয়েছিল এক বিশাল পাহাড়। ভারী বৃষ্টি ও মাটির স্যাঁতসেঁতে অবস্থায় সেই স্তূপ ভেঙে আশপাশের বসতিতে নেমে আসে। টানা ১০ দিনেরও বেশি অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের পর ৩৬টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এই দৃশ্য অনেকের মনে করিয়ে দেয় ২০০০ সালে কেসন সিটিতে পায়াতাস ডাম্পসাইট ধসের কথা, যেখানে শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। সেই ঘটনার পরই প্রণীত হয়েছিল ইকোলজিক্যাল সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট আইন। কিন্তু ২৫ বছর পরও একই চিত্র ফিরে এসেছে।
আইন আছে, প্রয়োগ নেই
ফিলিপাইনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে আইনের অভাব নেই। প্রযুক্তিও রয়েছে। সমস্যা হচ্ছে বাস্তবায়নে দুর্বলতা। পরিবেশবাদী সংগঠন ওশেনা ফিলিপাইনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ভন হার্নান্দেজের ভাষায়, সেবুর ঘটনা ছিল “ঘটবার অপেক্ষায় থাকা এক বিপর্যয়”। দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি।
আইন অনুযায়ী বর্জ্য উৎসস্থলেই আলাদা করার কথা, জৈব বর্জ্য কম্পোস্টে রূপান্তর, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান আলাদা করা এবং অবশিষ্ট অংশ প্রকৌশলসম্মত ল্যান্ডফিলে ফেলার নির্দেশনা রয়েছে। বাস্তবে অধিকাংশ বর্জ্যই সরাসরি ডাম্পসাইট বা ল্যান্ডফিলে চলে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই আলাদা করা বর্জ্যও শেষ পর্যন্ত একই স্থানে ফেলা হয়।
বর্জ্যের পরিমাণ ও স্যাশে অর্থনীতি
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ফিলিপাইন প্রতিদিন প্রায় ৬১ হাজার টন বর্জ্য উৎপাদন করে। এর প্রায় এক-চতুর্থাংশই প্লাস্টিক। এই প্লাস্টিকের বড় অংশ আসে তথাকথিত স্যাশে অর্থনীতি থেকে। নিম্নআয়ের পরিবারগুলো শ্যাম্পু, সাবান, ডিটারজেন্ট ছোট প্লাস্টিক প্যাকেটে কিনে, কারণ বড় বোতল একসঙ্গে কেনার সামর্থ্য তাদের নেই।
ম্যানিলার টন্ডো এলাকার গৃহিণী হ্যাজেল আতানাসিও বলেন, পরিবারের খাবারই তার প্রথম অগ্রাধিকার। বড় প্যাকেট কেনা দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী হলেও তাৎক্ষণিক খরচ জোগানো সম্ভব নয়। ফলে ছোট প্যাকেটই ভরসা।
প্রতিদিন প্রায় ১৬ কোটি ৩০ লাখ প্লাস্টিক স্যাশে ব্যবহার হয় দেশে। কিন্তু স্যাশেগুলোর পুনর্ব্যবহারযোগ্য মূল্য নেই। ইকোওয়েস্ট কোয়ালিশনের জাতীয় সমন্বয়ক আইলিন লুসেরোর মতে, বিক্রয়মূল্য না থাকায় বর্জ্য সংগ্রাহকেরাও এগুলো তুলতে আগ্রহী নন।
তবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে একমাত্র দোষী হিসেবে দেখলে মূল সমস্যা আড়াল হয়ে যায়। তারাই বরং বোতল, কার্ডবোর্ড, ধাতব টুকরা সংগ্রহ করে পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ায় যুক্ত করেন। যা বিক্রি করা যায় না, তা-ই শেষ পর্যন্ত ফেলে দিতে হয়।

ল্যান্ডফিলের ঝুঁকি ও ধসের কারণ
দেশজুড়ে এখন ৩০০টিরও বেশি ল্যান্ডফিল রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো নামমাত্র আধুনিক, বাস্তবে ডাম্পসাইটের মতোই পরিচালিত হয়। আইন অনুযায়ী ল্যান্ডফিলে শুধু অবশিষ্ট বর্জ্য যাওয়ার কথা। কিন্তু জৈব ও অজৈব সব বর্জ্য মিশে গেলে পচন প্রক্রিয়ায় তাপ ও মিথেন গ্যাস তৈরি হয়। ভারী বৃষ্টিতে স্তূপ আরও ভারী ও দুর্বল হয়ে পড়ে। একসময় তা ধসে যায়।
বিনালিউ ল্যান্ডফিল পরিদর্শনে অতিরিক্ত উচ্চতা, দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং অতিরিক্ত স্যাঁতসেঁতে বর্জ্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ধসের পরই কেবল কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ আসে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখানে শুধু জনসেবা নয়, বড় ব্যবসাও। ফলে স্থানীয় সরকার, বেসরকারি অপারেটর ও রাজনৈতিক প্রভাবের জটিল সম্পর্কও প্রশ্নের মুখে।
দুর্বল জবাবদিহি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি
সেবুতে ২০২৫ সালে ওমবাডসম্যান কার্যালয় একটি ডাম্পসাইট সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে কয়েকজন সিটি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগ আনে। কিন্তু এসব তদন্ত প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনার পর, আগে নয়।
ফিলিপাইনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব মূলত স্থানীয় সরকারের হাতে। কেন্দ্রীয় নীতিমালা থাকলেও বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা ও তদারকির ঘাটতি স্পষ্ট। বর্জ্য ইস্যু রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে খুব কমই জায়গা পায়—যতক্ষণ না ল্যান্ডফিল ধসে প্রাণহানি ঘটে।

সমাধানের পথ কোথায়
আরেকটি পায়াতাস বা বিনালিউ বিপর্যয় এড়াতে হলে দেশকে হয় বর্জ্য উৎপাদন কমাতে হবে, নয়তো নিরাপদ ও কার্যকর নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে। এখন পর্যন্ত কোনোটিই যথেষ্টভাবে করা যায়নি।
ফিলিপাইনের বর্জ্য সংকট কোনো রহস্য নয়। এটি শিল্পায়িত মাত্রার বর্জ্যকে ভাঙাচোরা, ল্যান্ডফিলনির্ভর ব্যবস্থায় সামলানোর ফল। যতদিন না আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, বর্জ্য হ্রাস এবং জবাবদিহি নিশ্চিত হচ্ছে, ততদিন ময়লার পাহাড় আবারও মৃত্যুর ফাঁদ হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















