মার্কিন রাজনীতিতে বহুদিন ধরেই ধনকুবের ও ক্ষমতাবানদের প্রভাব নিয়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু জেফ্রি এপস্টেইনকে ঘিরে প্রকাশিত বিপুল নথি যেন সেই আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। কে কাকে চিনতেন, কে কতটা জানতেন, আর কে ইচ্ছে করে চোখ বন্ধ রেখেছিলেন—এই প্রশ্ন এখন আরও জোরালো।
ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালির প্রভাবশালী এলাকা থেকে নির্বাচিত কংগ্রেস সদস্য রো খান্না দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তি খাত ও প্রগতিশীল রাজনীতির মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করে এসেছেন। প্রযুক্তি দুনিয়ার শীর্ষ ব্যক্তিদের সমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হলেও তিনি সম্পদ করের মতো প্রস্তাবের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন। তবে এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশের পর খান্নার অবস্থানেও দৃশ্যত পরিবর্তন এসেছে। তার ভাষায়, শুধু স্বপ্ন দেখালেই হবে না, জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
এপস্টেইন নথি প্রকাশ ও রাজনৈতিক চাপ
গত জুলাইয়ে এপস্টেইন নথি স্বচ্ছতা আইন উত্থাপন করা হয়। পরে তা প্রতিনিধি পরিষদে পাস হয়। প্রায় সাড়ে ৩৫ লাখ পৃষ্ঠা ইমেইল, বার্তা ও আদালতের নথি প্রকাশিত হয়েছে। তবে সরকার জানিয়েছে, মোট নথির সংখ্যা ৬০ লাখেরও বেশি। অর্থাৎ, এখনো অনেক কিছু জনসমক্ষে আসেনি।
খান্নার অভিযোগ, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ—অভিযোগকারীদের এফবিআইকে দেওয়া জবানবন্দি—এখনও প্রকাশ হয়নি। ফলে আমরা এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে অনেক বেশি জানলেও তার অপরাধের পূর্ণ চিত্র এখনো অজানা।
নেটওয়ার্কের বিস্তার ও ক্ষমতার বলয়
নথিতে দেখা যায়, এপস্টেইনের যোগাযোগ রাজনীতি, ব্যবসা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি—সব ক্ষেত্রেই বিস্তৃত ছিল। দার্শনিক থেকে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, সাবেক সরকারি উপদেষ্টা থেকে আন্তর্জাতিক ব্যাংকার—বিভিন্ন অঙ্গনের প্রভাবশালীদের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।
এই নেটওয়ার্কের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল পারস্পরিক সুবিধা। কেউ চাইতেন অর্থনৈতিক সংযোগ, কেউ সামাজিক মর্যাদা, কেউ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচয়। এপস্টেইন ছিলেন সেই সংযোগের মধ্যস্থতাকারী। অর্থের পাশাপাশি ‘যোগাযোগ’ ছিল তার সবচেয়ে বড় মুদ্রা।
গোপন সংকেত ও সন্দেহ
প্রকাশিত ইমেইলগুলোতে বারবার ‘গোপন’ ইঙ্গিত, ব্যক্তিগত আলাপের বাইরে কথা বলার অনুরোধ এবং সংবেদনশীল প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। এতে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে। বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি তার অতীত সম্পর্কে জানতেন—এমন ইঙ্গিতও মিলেছে।
২০০৮ সালে অপ্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও তার সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন অনেকে। কেউ সহানুভূতি জানিয়েছেন, কেউ ব্যক্তিগত সম্পর্ক অটুট রেখেছেন। প্রশ্ন উঠছে, তারা কি সত্যিই কিছু জানতেন না, নাকি সুবিধার জন্য নীরব ছিলেন?
ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা
একটি বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এপস্টেইনের সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও তাকে দীর্ঘদিন গ্রাহক হিসেবে রাখা হয়েছিল, কারণ তিনি প্রভাবশালী ও ধনী ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সংযোগ ঘটাতে পারতেন। শেষ পর্যন্ত সম্পর্ক ছিন্ন হলেও ততদিনে অনেক কিছু ঘটে গেছে।
‘এপস্টেইন ক্লাস’ বিতর্ক
রো খান্না এখন ‘এপস্টেইন ক্লাস’ শব্দটি ব্যবহার করছেন। তার মতে, এটি এমন এক গোষ্ঠী, যারা নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে ভাবেন। এখানে ব্যক্তিগত চরিত্রের চেয়ে বেশি মূল্য পায় সংযোগের ঘনত্ব ও প্রভাবের বিস্তার।
বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক যুগে ক্ষমতার সংজ্ঞা বদলে গেছে। আগে ক্ষমতা আসত ভূমি, বংশ বা পদবির মাধ্যমে। এখন ক্ষমতা নির্ভর করে আপনি কার সঙ্গে যুক্ত, কতটা প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের অংশ। ফলে সম্পর্ক ছিন্ন করা মানে প্রভাব হারানো—এ কারণেই অনেকেই নীরব থেকেছেন।
জবাবদিহির দাবি জোরদার
খান্না স্পষ্ট করেছেন, তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতি চান না। তবে গণতন্ত্রে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে এলিটদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তার মতে, ন্যায়বিচারের বোধ ছাড়া বৃহত্তর সামাজিক সংস্কার সম্ভব নয়।
এপস্টেইন নেটওয়ার্ক যত বিস্তৃতই হোক, এটি পুরো সমাজের প্রতিচ্ছবি নয়। অনেকেই দূরে থেকেছেন। কিন্তু প্রকাশিত নথি দেখিয়ে দিয়েছে, ক্ষমতা ও সংযোগের জালে কীভাবে একজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন নিজেকে আড়াল করে রাখতে পেরেছিলেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















