০৩:৫১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
অনিয়মিত ঘুমে জাপানের বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন: নতুন গবেষণা সতর্ক করে দিল চীনের তরুণদের একা থাকার নতুন দর্শন: ‘নিজেকেই ভালোবাসো’ প্রজন্মের উত্থান বিশ্বে মানুষের আস্থাহীনতা বাড়ছে, সমাজও সংকটে ব্রস এবং প্যারামাউন্টের নতুন আলোচনার ধারা শুরু ইরানের ইতিহাস বদলে দেয় সেই বিপ্লব, আজ নারী ত্যাগের পথে অদম্য ইরানি প্রতিবাদ ও মানবিক সংগ্রাম: ইতিহাস, স্মৃতি ও আশা ইরানে সহিংসতার ছায়া: জনতার আন্দোলন ও প্রশাসনের কঠোর জবাব রমজানে মূল্য স্থিতিশীল রাখতে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর রমজানের পবিত্র মাস শুরু বৃহস্পতিবার দালালের ফাঁদে সৌদি গিয়ে নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ আকলিমা, দেশে ফেরানোর দাবি পরিবারের

চীনের তরুণদের একা থাকার নতুন দর্শন: ‘নিজেকেই ভালোবাসো’ প্রজন্মের উত্থান

চীনের শহুরে তরুণদের জীবনে দ্রুত বদল আসছে। পরিবারকেন্দ্রিক সমাজে বড় হওয়া এই প্রজন্ম এখন শিখছে একা থাকতে, একা খেতে, একা সিদ্ধান্ত নিতে। কাজের চাপের পর নিজেকে একটু আনন্দ দেওয়ার জন্য তারা নতুন এক মন্ত্রে বিশ্বাস করছে—নিজেকেই ভালোবাসো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি জনপ্রিয় বাক্যাংশের মাধ্যমে তারা নিজেদের জন্য খরচ করাকে এখন স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় বলে মনে করছে।

নিজেকে পুরস্কার দেওয়ার সংস্কৃতি

গত বছরের শেষ দিকে চীনা সামাজিক মাধ্যমে একটি বাক্য ছড়িয়ে পড়ে, যার অর্থ দাঁড়ায় ‘প্রিয় বন্ধু, নিজেকে ভালোবাসো’। তরুণরা ভিডিও, পোস্ট ও মন্তব্যে এই বাক্য ব্যবহার করে নিজেদের জন্য খরচ করাকে যুক্তিযুক্ত করে তুলছে। অনেকেই কাজের চাপের পর দামী খেলনা, ব্যাগ, ক্যামেরার লেন্স বা পছন্দের খাবার কিনে সেটাকেই আত্ম-পুরস্কার হিসেবে দেখছেন।

বেইজিংয়ের তরুণী সিলভিয়া ঝু, যিনি এখন বিদেশে থাকেন, বলেন জীবনের সংগ্রাম আর অনিশ্চয়তার মাঝেই তরুণরা নিজেদের ছোট ছোট আনন্দে বাঁচিয়ে রাখছে। তার মতে, জীবন ছোট—আগামীকাল কী হবে কেউ জানে না। তাই সামর্থ্যের মধ্যে থাকলে নিজেকে খুশি রাখা দোষের কিছু নয়।

অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বদলে যাওয়া সাফল্যের সংজ্ঞা

বিশ্লেষকদের মতে, এই মানসিকতা হঠাৎ তৈরি হয়নি। চীনের প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজার, স্থবির আয় এবং বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয় তরুণদের ভাবতে বাধ্য করছে। বিয়ে, বাড়ি কেনা বা স্থায়ী চাকরি—যা আগে সাফল্যের মাপকাঠি ছিল—তা এখন অনেকের নাগালের বাইরে। ফলে তরুণরা নতুন করে ভাবছে, ভালো জীবন মানে আসলে কী।

বিশেষজ্ঞ অ্যাশলি দুদারেনক জানান, দ্রুত নগরায়ন ও ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার সমাজের কাঠামো বদলে দিয়েছে। পরিবার থেকে দূরে বড় শহরে এসে একা বসবাস এখন সাধারণ ঘটনা। ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চীনে একক পরিবার বা একা বসবাসকারীর সংখ্যা ১০ কোটির বেশি। ২০৩০ সালের মধ্যে তা ১৫ থেকে ২০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে।

Young adults in China are learning to live alone | Time - news - Read this  story on Magzter.com

একা থাকার বাজার ও কৃত্রিম সঙ্গ

একা বসবাস বাড়ায় রেস্তোরাঁ, পোষা প্রাণী ও এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সঙ্গীর বাজারও বাড়ছে। সরকার ইতিমধ্যে কৃত্রিম সঙ্গী নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিয়েছে। কারণ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই নতুন ধরনের সঙ্গ চীনা সমাজে স্থায়ী রূপ নিচ্ছে।

সম্প্রতি একটি মোবাইল অ্যাপ আলোচনায় এসেছে, যার কাজ খুব সহজ। ব্যবহারকারী প্রতিদিন একটি বোতামে চাপ দিয়ে জানান দেন যে তিনি বেঁচে আছেন। টানা দুই দিন তা না করলে নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে বার্তা চলে যায়। অনেক তরুণের কাছে এটি এক ধরনের নিরাপত্তা বোধ দিলেও, অন্যদের মতে এটি আধুনিক জীবনের নিঃসঙ্গতার প্রতিচ্ছবি।

উৎসবেও বদলে যাচ্ছে সম্পর্কের ধরন

চীনের সবচেয়ে বড় উৎসব চান্দ্র নববর্ষ ঐতিহ্যগতভাবে পরিবারকেন্দ্রিক। তবে সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, তরুণদের বড় অংশ এখন উৎসবে সরাসরি সাক্ষাতের চেয়ে অনলাইনে বেশি সময় কাটায়। ভার্চুয়াল লাল খাম পাঠানো, অনলাইন গোষ্ঠীতে উদ্‌যাপন কিংবা প্রভাবশালীদের সঙ্গে ডিজিটাল যোগাযোগ এখন নতুন বাস্তবতা।

তবে তরুণরা ঐতিহ্য ভাঙছে না, বরং নতুনভাবে সাজাচ্ছে। পরিবার এখনও গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে নিজের পছন্দের সম্প্রদায়।

প্রজন্মের দ্বন্দ্ব ও ‘কম চাহিদার জীবন’

পরিবারের প্রত্যাশা এখনও প্রবল। বিশেষ করে নারীরা পেশা ও বিয়ে নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন। জন্মহার কমে যাওয়াও বড় উদ্বেগ। তবু অর্থনৈতিক চাপ ও মানসিক ক্লান্তি অনেক তরুণকে ‘কম চাহিদার জীবন’ বেছে নিতে উদ্বুদ্ধ করছে। কেউ বড় শহর ছেড়ে ছোট শহরে যাচ্ছে, কেউ দীর্ঘ কর্মঘণ্টা প্রত্যাখ্যান করছে।

আগের প্রজন্মের কাছে সাফল্য মানে ছিল স্থায়িত্ব—নিজস্ব বাড়ি, স্থায়ী চাকরি, বিয়ে ও সন্তান। কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে সাফল্য মানে মানসিক সুস্থতা, আর্থিক স্বাধীনতা, নিজের জন্য সময় ও সম্পর্কের গভীরতা।

এই পরিবর্তন হয়তো নিছক ভোগবাদ নয়। বরং এটি এমন এক প্রজন্মের গল্প, যারা কঠিন বাস্তবতার মধ্যে থেকেও নিজের মতো করে বাঁচার সংজ্ঞা খুঁজে নিচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

অনিয়মিত ঘুমে জাপানের বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন: নতুন গবেষণা সতর্ক করে দিল

চীনের তরুণদের একা থাকার নতুন দর্শন: ‘নিজেকেই ভালোবাসো’ প্রজন্মের উত্থান

০২:০০:১০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

চীনের শহুরে তরুণদের জীবনে দ্রুত বদল আসছে। পরিবারকেন্দ্রিক সমাজে বড় হওয়া এই প্রজন্ম এখন শিখছে একা থাকতে, একা খেতে, একা সিদ্ধান্ত নিতে। কাজের চাপের পর নিজেকে একটু আনন্দ দেওয়ার জন্য তারা নতুন এক মন্ত্রে বিশ্বাস করছে—নিজেকেই ভালোবাসো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি জনপ্রিয় বাক্যাংশের মাধ্যমে তারা নিজেদের জন্য খরচ করাকে এখন স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় বলে মনে করছে।

নিজেকে পুরস্কার দেওয়ার সংস্কৃতি

গত বছরের শেষ দিকে চীনা সামাজিক মাধ্যমে একটি বাক্য ছড়িয়ে পড়ে, যার অর্থ দাঁড়ায় ‘প্রিয় বন্ধু, নিজেকে ভালোবাসো’। তরুণরা ভিডিও, পোস্ট ও মন্তব্যে এই বাক্য ব্যবহার করে নিজেদের জন্য খরচ করাকে যুক্তিযুক্ত করে তুলছে। অনেকেই কাজের চাপের পর দামী খেলনা, ব্যাগ, ক্যামেরার লেন্স বা পছন্দের খাবার কিনে সেটাকেই আত্ম-পুরস্কার হিসেবে দেখছেন।

বেইজিংয়ের তরুণী সিলভিয়া ঝু, যিনি এখন বিদেশে থাকেন, বলেন জীবনের সংগ্রাম আর অনিশ্চয়তার মাঝেই তরুণরা নিজেদের ছোট ছোট আনন্দে বাঁচিয়ে রাখছে। তার মতে, জীবন ছোট—আগামীকাল কী হবে কেউ জানে না। তাই সামর্থ্যের মধ্যে থাকলে নিজেকে খুশি রাখা দোষের কিছু নয়।

অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বদলে যাওয়া সাফল্যের সংজ্ঞা

বিশ্লেষকদের মতে, এই মানসিকতা হঠাৎ তৈরি হয়নি। চীনের প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজার, স্থবির আয় এবং বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয় তরুণদের ভাবতে বাধ্য করছে। বিয়ে, বাড়ি কেনা বা স্থায়ী চাকরি—যা আগে সাফল্যের মাপকাঠি ছিল—তা এখন অনেকের নাগালের বাইরে। ফলে তরুণরা নতুন করে ভাবছে, ভালো জীবন মানে আসলে কী।

বিশেষজ্ঞ অ্যাশলি দুদারেনক জানান, দ্রুত নগরায়ন ও ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার সমাজের কাঠামো বদলে দিয়েছে। পরিবার থেকে দূরে বড় শহরে এসে একা বসবাস এখন সাধারণ ঘটনা। ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চীনে একক পরিবার বা একা বসবাসকারীর সংখ্যা ১০ কোটির বেশি। ২০৩০ সালের মধ্যে তা ১৫ থেকে ২০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে।

Young adults in China are learning to live alone | Time - news - Read this  story on Magzter.com

একা থাকার বাজার ও কৃত্রিম সঙ্গ

একা বসবাস বাড়ায় রেস্তোরাঁ, পোষা প্রাণী ও এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সঙ্গীর বাজারও বাড়ছে। সরকার ইতিমধ্যে কৃত্রিম সঙ্গী নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিয়েছে। কারণ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই নতুন ধরনের সঙ্গ চীনা সমাজে স্থায়ী রূপ নিচ্ছে।

সম্প্রতি একটি মোবাইল অ্যাপ আলোচনায় এসেছে, যার কাজ খুব সহজ। ব্যবহারকারী প্রতিদিন একটি বোতামে চাপ দিয়ে জানান দেন যে তিনি বেঁচে আছেন। টানা দুই দিন তা না করলে নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে বার্তা চলে যায়। অনেক তরুণের কাছে এটি এক ধরনের নিরাপত্তা বোধ দিলেও, অন্যদের মতে এটি আধুনিক জীবনের নিঃসঙ্গতার প্রতিচ্ছবি।

উৎসবেও বদলে যাচ্ছে সম্পর্কের ধরন

চীনের সবচেয়ে বড় উৎসব চান্দ্র নববর্ষ ঐতিহ্যগতভাবে পরিবারকেন্দ্রিক। তবে সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, তরুণদের বড় অংশ এখন উৎসবে সরাসরি সাক্ষাতের চেয়ে অনলাইনে বেশি সময় কাটায়। ভার্চুয়াল লাল খাম পাঠানো, অনলাইন গোষ্ঠীতে উদ্‌যাপন কিংবা প্রভাবশালীদের সঙ্গে ডিজিটাল যোগাযোগ এখন নতুন বাস্তবতা।

তবে তরুণরা ঐতিহ্য ভাঙছে না, বরং নতুনভাবে সাজাচ্ছে। পরিবার এখনও গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে নিজের পছন্দের সম্প্রদায়।

প্রজন্মের দ্বন্দ্ব ও ‘কম চাহিদার জীবন’

পরিবারের প্রত্যাশা এখনও প্রবল। বিশেষ করে নারীরা পেশা ও বিয়ে নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন। জন্মহার কমে যাওয়াও বড় উদ্বেগ। তবু অর্থনৈতিক চাপ ও মানসিক ক্লান্তি অনেক তরুণকে ‘কম চাহিদার জীবন’ বেছে নিতে উদ্বুদ্ধ করছে। কেউ বড় শহর ছেড়ে ছোট শহরে যাচ্ছে, কেউ দীর্ঘ কর্মঘণ্টা প্রত্যাখ্যান করছে।

আগের প্রজন্মের কাছে সাফল্য মানে ছিল স্থায়িত্ব—নিজস্ব বাড়ি, স্থায়ী চাকরি, বিয়ে ও সন্তান। কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে সাফল্য মানে মানসিক সুস্থতা, আর্থিক স্বাধীনতা, নিজের জন্য সময় ও সম্পর্কের গভীরতা।

এই পরিবর্তন হয়তো নিছক ভোগবাদ নয়। বরং এটি এমন এক প্রজন্মের গল্প, যারা কঠিন বাস্তবতার মধ্যে থেকেও নিজের মতো করে বাঁচার সংজ্ঞা খুঁজে নিচ্ছে।