পাকিস্তানের আদিয়ালা জেলে বন্দি দেশটির প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খানের স্বাস্থ্যের ক্রমাবনতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে পাকিস্তান সরকারকে একটি চিঠি লিখেছেন ১৪ জন প্রাক্তন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অধিনায়ক।
এদের মধ্যে আছেন পাকিস্তানের চির প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের দুই প্রাক্তন ক্রিকেট অধিনায়ক – সুনীল গাভাস্কার ও কপিল দেব।
ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআই এবং এএনআই – উভয়ই খবর দিয়েছে যে ওই চিঠিতে প্রাক্তন ক্রিকেট অধিনায়করা পাকিস্তান সরকারের কাছে আবেদন করেছেন যাতে ইমরান খানের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সও এই খবরের নিশ্চয়তা স্বীকার করেছে।
সুনীল গাভাস্কার ও কপিল দেব ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন ক্যাপ্টেন অ্যালান বর্ডার, স্টিভ ওয়া, ইয়ান চ্যাপেল আর কিম হিউজ যেমন আছেন, তেমনই অস্ট্রেলিয়ার নারী ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক বেলিন্ডা ক্লার্কও আছেন।
ইংল্যান্ডের মাইক অ্যাথর্টন, নাসির হুসেইন, মাইক ব্রেয়ারলি এবং ডেভিড গাওয়ার, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্লাইভ লয়েড ও নিউজিল্যান্ডের জন রাইটও ওই চিঠিতে সই করেছেন।

কী লেখা হয়েছে চিঠিতে?
পাকিস্তান সরকারের উদ্দেশ্যে প্রাক্তন ক্রিকেট অধিনায়করা ওই চিঠিতে লিখেছেন, “আমরা নিজ নিজ দেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক এবং ইমরান খানের সঙ্গে কথিত আচরণ এবং কারাগারের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। ইমরান খান পাকিস্তানের প্রাক্তন অধিনায়ক এবং বিশ্ব ক্রিকেটের এক কিংবদন্তি খেলোয়াড়।”
“ক্রিকেটে ইমরান খানের অবদান সারা বিশ্ব প্রশংসিত। অধিনায়ক হিসাবে, তিনি ১৯৯২ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে পাকিস্তানের ঐতিহাসিক জয়ের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই জয় ছিল এমনই, যার ভিত্তি ছিল দক্ষতা, অধ্যবসায়, নেতৃত্ব আর খেলোয়াড়সুলভ ভাবনা। ওই জয়লাভ একের পর এক প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে এসেছে,” লিখেছেন প্রাক্তন অধিনায়করা।
তারা আরও লিখেছেন, “আমাদের মধ্যে কেউ তার বিপক্ষে খেলেছি, তার সঙ্গে ময়দানে থেকেছি অথবা তার সর্বাত্মক দক্ষতা, ব্যক্তিত্ব আর প্রতিস্পর্ধী মনোভাবের কারণে তাকে নিজেদের আদর্শ বলে মেনে নিয়েছি। এখনও তার নাম বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার আর অধিনায়কদের তালিকায় আছে, যাকে প্লেয়ার, দর্শক আর প্রশাসক – সকলেই সম্মান করে থাকেন।”
“ক্রিকেটের পাশাপাশি ইমরান খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। কঠিন সময়ে তিনি দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। রাজনৈতিক দিক থেকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নিজ দেশের সর্বোচ্চ পদে নির্বাচিত হওয়ার সম্মানও পেয়েছেন তিনি,” লেখা হয়েছে ওই চিঠিতে।
ক্রিকেট আর রাজনীতির ময়দানে ইমরান খানের অবদান মনে করিয়ে দেওয়ার পরেই এসেছে সাম্প্রতিক কিছু সংবাদ, যেখানে মি. খানের স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানানো হয়েছে। বিশেষ করে উল্লেখ করা হয়েছে যে তার দৃষ্টিশক্তির দ্রুত অবনতির কথাটি। গত আড়াই বছর ধরে জেলে থাকাকালীন সেখানকার অবস্থা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
চিঠিতে লেখা হয়েছে, “ক্রিকেটার হিসেবে আমরা নিরপেক্ষতা, সম্মান আর খেলোয়াড়সুলভ মনোভাবকে যে মূল্য দিয়ে থাকি, তা খেলার মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। আমরা বিশ্বাস করি যে ইমরান খানের মতো ব্যক্তির সঙ্গে মর্যাদা ও মৌলিক মানবিক সংবেদনশীলতার সঙ্গে আচরণ করা উচিত।”

তিনটি দাবি তোলা হয়েছে
ওই চিঠিতে পাকিস্তান সরকারের কাছে তিনটি দাবি জানানো হয়েছে। প্রথমত, ইমরান খানের ইচ্ছানুযায়ী যোগ্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের দিয়ে অবিলম্বে এবং ধারাবাহিকভাবে তার চিকিৎসা করানো হোক।
দ্বিতীয়ত, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাৎ সহ আন্তর্জাতিক মাপকাঠি অনুযায়ী কারাগারে মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা হোক।
তৃতীয় দাবিটি হলো, কোনো বিলম্ব না করে বা কোনো বাধা ছাড়াই সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়া যাতে তার কাছে পৌছয়, তা নিশ্চিত করা হোক।
প্রাক্তন ক্রিকেট অধিনায়করা তাদের চিঠিতে লিখেছেন, “ক্রিকেট সবসময়ই বিভিন্ন দেশের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করেছে। মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্টাম্প তুলে নেওয়ার সঙ্গেই শেষ হয়, তবে সম্মানটা থেকেই যায়। ইমরান খান তার পুরো ক্যারিয়ারে এই মনোভাব বজায় রেখেছেন।
“আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানাচ্ছি যে তারা যেন মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের সেই নীতিগুলি পালন করেন,” লেখা হয়েছে চিঠিতে।
আবার এটাও উল্লেখ করা হয়েছে যে “আইনি প্রক্রিয়ায় কোনো হস্তক্ষেপ নয়, শুধুমাত্র খেলোয়াড়সুলভ মনোভাব ও মানবিকতার ভিত্তিতেই এই আবেদন করা হচ্ছে।”

ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা কেমন?
পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পিটিআই দাবি করেছে যে তার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি মাত্র ১৫ শতাংশ অবশিষ্ট আছে।
বিবিসি নিউজ উর্দুর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত রোববার পাকিস্তান সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ইমরান খানের চোখের চিকিৎসার জন্য তাকে একটি ‘বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে’ স্থানান্তর করা হবে।
পাকিস্তানের মন্ত্রী আতা তারাড জানিয়েছেন, “এতদিন ইমরান খানের যে চিকিৎসা চলছিল, তার সঙ্গে এখন থেকে তার চোখের পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং চিকিৎসা একটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের চক্ষু চিকিৎসকদের মাধ্যমে করা হবে। সুপ্রিম কোর্টে এর বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।’
সুপ্রিম কোর্ট পাকিস্তান সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিল যাতে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের চোখের পরীক্ষা নিরীক্ষা কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতিতে করানো হয়। আবার আদালতের নির্দেশের পরেই ইমরান খানের সঙ্গে তার সন্তানদের কথাও বলানো হয়েছিল।
ইমরান খানের চিকিৎসার দাবিতে প্রতিবাদের সঙ্গেই তার মুক্তির দাবিও জানাচ্ছে তার দল পিটিআই।
বিবিসি বাংলা
Sarakhon Report 



















