চীনের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও রোবোটিক্স গবেষণায় নেতৃত্ব দিতে মিলেনিয়াল ও জেন জেড প্রজন্মের প্রতিভাদের প্রধান বিজ্ঞানী হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছে। টেনসেন্ট হোল্ডিংস থেকে শুরু করে অ্যাজিবট—একাধিক কোম্পানি ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি দৌড়ে তরুণদের ওপর ভরসা রাখছে।
তরুণ প্রতিভার উত্থান
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন ভিনসেস ইয়াও শুনইউ, যার বয়স এ বছর ২৮ হবে। তিনি আগে ওপেনএআই-এর গবেষক ছিলেন। গত ডিসেম্বর মাসে তিনি টেনসেন্টে প্রধান এআই বিজ্ঞানী হিসেবে যোগ দেন এবং সরাসরি প্রেসিডেন্ট মার্টিন লাউ চি-পিংয়ের কাছে রিপোর্ট করেন।
প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি ও ছিংহুয়া ইউনিভার্সিটির স্নাতক ইয়াও ওপেনএআইয়ের প্রথম দিকের এআই এজেন্ট—অপারেটর ও ডিপ রিসার্চ—উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। টেনসেন্টে যোগ দেওয়ার পর জানুয়ারিতে প্রকাশিত তার প্রথম গবেষণাপত্রে বলা হয়, ভবিষ্যতের এআই মডেল উন্নয়নে “কনটেক্সট লার্নিং”কে কেন্দ্রীয় স্থানে রাখা উচিত, যাতে মডেলের দক্ষতা বাড়ে।

অভিজ্ঞদের সঙ্গে নতুন প্রজন্ম
ইয়াওয়ের পাশাপাশি টেনসেন্টে রয়েছেন কম্পিউটার ভিশন বিশেষজ্ঞ ঝ্যাং ঝেংইউ, যিনি ২০১৮ সালে গুগলে দুই দশক কাজ করার পর কোম্পানিটিতে যোগ দেন। ২০১৩ সালে তিনি আন্তর্জাতিক কম্পিউটার ভিশন সম্মেলনে দ্বিবার্ষিক হেলমহোল্টজ পুরস্কার পান। তার উদ্ভাবিত “ঝ্যাং’স ক্যামেরা ক্যালিব্রেশন মেথড” থ্রিডি কম্পিউটার ভিশনের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখে।
প্রাইমবট ও অ্যাজিবটের পদক্ষেপ
সম্প্রতি প্রধান বিজ্ঞানী পদ পূরণ করা কোম্পানির মধ্যে রয়েছে প্রাইমবট, যা শাংহাইয়ে তালিকাভুক্ত সোয়ানকর অ্যাডভান্সড ম্যাটেরিয়ালসের অধীন রোবোটিক্স ইউনিট এবং বর্তমানে অ্যাজিবটের নিয়ন্ত্রণে।
জানুয়ারির শুরুতে প্রাইমবট পিকিং ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডং হাওকে প্রধান বিজ্ঞানী নিয়োগ দেয়। নব্বইয়ের পর জন্ম নেওয়া ডং বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স স্কুলের টেনিউরপ্রাপ্ত সহযোগী অধ্যাপক এবং তিনি ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন থেকে পিএইচডি অর্জন করেন।
অন্যদিকে অ্যাজিবট গত বছর তাদের প্রধান বিজ্ঞানী হিসেবে নিয়োগ দেয় ৩৩ বছর বয়সী লুও জিয়ানলানকে। তিনি আগে গুগলের “মুনশট ফ্যাক্টরি” গুগল এক্স এবং এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান গুগল ডিপমাইন্ডে কাজ করেছেন। লুও বিখ্যাত কম্পিউটার বিজ্ঞানী সের্গেই লেভিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন, যিনি সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক এআই স্টার্টআপ ফিজিক্যাল ইন্টেলিজেন্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা।

প্রধান বিজ্ঞানীর ভূমিকা কী
কেপিএমজি চায়নার সিনিয়র পার্টনার গাও রেনবো বলেন, প্রধান বিজ্ঞানীর মূল দায়িত্ব হলো মৌলিক গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া, প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান এগিয়ে নেওয়া এবং বৈজ্ঞানিক উদ্যোগের কৌশল নির্ধারণ করা।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই পদ সরাসরি পণ্য বাস্তবায়ন বা বাণিজ্যিকীকরণের সঙ্গে জড়িত নয়; বরং কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা সক্ষমতা গড়ে তোলাই এর লক্ষ্য। বিপরীতে প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিটিও) প্রযুক্তি দল পরিচালনা, পণ্যের আর্কিটেকচার, প্রযুক্তি সমাধান বাস্তবায়ন এবং ব্যবসায়িক লক্ষ্য অর্জনের দিকে নজর দেন।
পদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
প্রধান বিজ্ঞানীর ধারণা ১৯৪০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটন প্রজেক্ট ও অ্যাপোলো প্রোগ্রামের সময় থেকে শুরু। তখন হাজারো বিজ্ঞানীকে একত্র করে বড় গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করা হতো।
বেইজিংভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকাডেমিশিয়ান সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইনোভেশন সেন্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শুরুতে এই পদ ছিল মূলত গবেষণা প্রকল্প ও সরকারি সংস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং বাজেট ব্যবস্থাপনাসহ প্রকল্প পরিচালনার দায়িত্ব ছিল তাদের ওপর।
২১শ শতকে এসে প্রযুক্তিনির্ভর কোম্পানিগুলো ক্রমেই এই পদ চালু করতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রধান বিজ্ঞানীর ভূমিকা প্রকল্প নেতৃত্ব থেকে বিকশিত হয়ে নতুন জ্ঞানক্ষেত্রের পথপ্রদর্শকে রূপ নিয়েছে।

মার্কিন কোম্পানিতেও একই ধারা
শুধু চীন নয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি জায়ান্টগুলিও মিলেনিয়ালদের প্রধান বিজ্ঞানী করছে। মেটা প্ল্যাটফর্মসের মেটা সুপারইন্টেলিজেন্স ল্যাবের প্রধান বিজ্ঞানী ঝাও শেংজিয়া—যিনি ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি সহ-উদ্ভাবক—বর্তমানে ত্রিশের কোঠায়। ওপেনএআইয়ের বর্তমান প্রধান বিজ্ঞানী ইয়াকুব পাচোচকির বয়সও প্রায় ৩৫।
কৌশল বদলাচ্ছে কিছু কোম্পানি
তবে সব কোম্পানি এই পদ ধরে রাখেনি। আলিবাবা গ্রুপে ২০১৫ সালে ক্লাউড ইউনিটের প্রধান বিজ্ঞানী হিসেবে যোগ দেওয়া ঝৌ জিংরেন এখন প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা।
বাইডু ২০১৪ সালে অ্যান্ড্রু এনগকে প্রধান বিজ্ঞানী হিসেবে নিয়োগ দিয়ে আলোচনায় আসে, কিন্তু তিন বছর পর তিনি পদত্যাগ করেন এবং বর্তমানে কোম্পানিতে এই পদ নেই।

কৌশলগত বার্তা
গাও রেনবোর মতে, কোনো প্রযুক্তি কোম্পানি প্রধান বিজ্ঞানীর পদ রাখছে কি না—তা তাদের কৌশলগত দিকনির্দেশনা সম্পর্কে ধারণা দেয়। যেসব প্রতিষ্ঠান এই পদ বজায় রাখে, তারা সাধারণত মৌলিক প্রযুক্তির স্বাধীন গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে বেশি গুরুত্ব দেয় এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি খাতে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্য রাখে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















