ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোর ঐতিহ্যবাহী কার্নিভালের এক অনন্য রূপ আবারও চোখে পড়ল শহরের রাস্তায়। ঝলমলে আনুষ্ঠানিক শোভাযাত্রার বাইরে, ‘বই তলো’ নামের এই ঘুরে বেড়ানো উৎসব যেন শহরের প্রাণে নতুন করে আগুন জ্বালিয়েছে। ক্লান্তি উপেক্ষা করে হাজারো মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা নেচে–গেয়ে ধরে রাখছে এই রাস্তার ঐতিহ্য।
ভোরের আগেই জমে ওঠে চত্বর
রবিবার ভোর হওয়ার আগেই শহরের ঐতিহাসিক এলাকার একটি চত্বর ভরে যেতে শুরু করে উৎসবপ্রেমীদের ভিড়ে। কেউ ঝলমলে পোশাকে, কেউ আবার রাতভর অন্য পার্টি করে এসে ঘাসের ওপর একটু ঘুমিয়ে নিচ্ছিল। বাদ্যযন্ত্র কাঁধে নিয়ে সংগীতশিল্পীরা পৌঁছাতেই শুরু হয় আসল উন্মাদনা।
‘বই তলো’ কোনো নির্দিষ্ট সময়, স্ক্রিপ্ট বা পথ মেনে চলে না। হাজারো মানুষ একসঙ্গে উচ্ছ্বাসে মেতে শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে চলে। যারা শুরু মিস করে, তারা দিনভর খোঁজে থাকে—উৎসব এখন কোথায়।
সহনশক্তির চরম পরীক্ষা
অংশগ্রহণকারীরা বলছেন, এই শোভাযাত্রার সঙ্গে তাল মেলানো সহজ নয়। অনেকেই মাঝপথে ভেবে বসেন থেমে যাবেন কি না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভিড়ের টানেই এগিয়ে চলেন। অনেকের কাছে এটি যেন সহনশক্তির এক চূড়ান্ত পরীক্ষা।

সকাল গড়াতেই সংগীতের তালে তালে ভিড় কয়েকশ থেকে দ্রুত হাজারে পৌঁছে যায়। তামা, ঢাক ও পারকাশনের তালে তৈরি হয় তাৎক্ষণিক সুরের ঝড়। ব্যান্ডকে ঘিরে মানবশৃঙ্খল তৈরি করে সরু রাস্তা দখল করে নেয় উৎসবের ঢল, থমকে যায় যান চলাচল।
‘চলতেই হবে’—এটাই নিয়ম
এই উৎসবের অলিখিত নিয়ম একটাই—থামা যাবে না। কেউ আবেগে থেমে গেলেই চারদিক থেকে শোনা যায়, “চুমু দাও, কিন্তু হাঁটো।” আয়োজকদের একজন জানান, পথও ঠিক হয় মুহূর্তের সিদ্ধান্তে।
দুই দশক আগে একদল মানুষ ভুল সংবাদে বিভ্রান্ত হয়ে পার্টি খুঁজতে গিয়ে এই উৎসবের জন্ম দেন। হতাশ হয়ে তারা নিজেরাই গান–বাদ্য জোগাড় করে রাস্তায় নেমে পড়েন। কার্ডবোর্ডে লেখা হয় ‘বই তলো’—অর্থাৎ ‘বোকা ষাঁড়’। সেখান থেকেই শুরু, আর এখন প্রতি বছর এতে জড়ো হয় হাজার হাজার মানুষ।
তাপদাহেও থামে না উচ্ছ্বাস
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাড়তি গরম ও পর্যটকের চাপ উৎসবকে আরও কঠিন করে তুলেছে। এ বছর তাই একটু আগে শুরু করা হয়। তবুও তাপমাত্রা বেড়ে গেলে অনেকে পানি ছিটিয়ে বা হাতপাখা দিয়ে নিজেদের ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করেন।
প্রখর রোদেও নাচ থামেনি। কেউ সাময়িক অসুস্থ হয়ে পড়লেও কিছুক্ষণ পর আবার ভিড়ে মিশে গেছেন। দুপুর গড়িয়ে বিকেলে শোভাযাত্রা পৌঁছে যায় সমুদ্রসৈকতের দিকে, যেখানে উল্লাস যেন নতুন মাত্রা পায়।
১২ ঘণ্টা পরও শেষ নয়
প্রায় ১২ ঘণ্টা শহর ঘুরে বেড়ানোর পরও অনেকের উৎসাহ কমেনি। সন্ধ্যা নামার সময়ও তারা আবার শহরের কেন্দ্রের দিকে ফিরতে থাকে। সৈকতের বালুতেও লাফিয়ে লাফিয়ে অনেকে চিৎকার করে বলেন, তারা ঘরে ফিরবেন না।
উৎসবে নতুন যোগ দেওয়া তরুণীদের একজন বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, এতক্ষণ ধরে যেটার খোঁজ করছিলেন, অবশেষে সেটিই তিনি পেয়ে গেছেন। মুখভরা হাসিতে তার প্রতিক্রিয়া যেন পুরো উৎসবেরই প্রতিচ্ছবি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















