দীর্ঘ দুই বছর ছয় মাসের আইনি লড়াই, বিপুল আইনজীবী খরচ এবং দুঃস্বপ্নময় উদ্বেগের পর অবশেষে নিজের শর্তেই পর্দায় এলেন নোবেলজয়ী তুর্কি সাহিত্যিক ওরহান পামুক। তার বহুল আলোচিত উপন্যাস ‘দ্য মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’ অবলম্বনে নির্মিত নয় পর্বের ধারাবাহিক এখন বিশ্বব্যাপী প্রচারিত হচ্ছে। প্রতিটি পর্বের চিত্রনাট্যের পাতায় নিজ হাতে অনুমোদন দিয়েছেন লেখক, যাতে গল্পের মূল সুর একটুও বদলে না যায়।
গল্প বিকৃতির আশঙ্কা থেকেই মামলা
ছয় বছর আগে যখন উপন্যাসটির টেলিভিশন সংস্করণের সংক্ষিপ্ত কাহিনি হাতে পান পামুক, তখনই তিনি চমকে ওঠেন। প্রায় পাঁচশ পৃষ্ঠার বেশি বিস্তৃত প্রেম ও আসক্তির কাহিনিকে সংক্ষিপ্ত করতে গিয়ে প্রযোজনা সংস্থা এমন সব পরিবর্তন এনেছিল, যা লেখকের কাছে ছিল অগ্রহণযোগ্য। নতুন মোড়, অপ্রত্যাশিত ঘটনা—সব মিলিয়ে গল্পের আত্মাই বদলে যাচ্ছিল।
এই অবস্থায় তিনি প্রযোজনা সংস্থার বিরুদ্ধে মামলা করেন এবং শেষ পর্যন্ত স্বত্ব ফিরে পান। সেই সময়টাকে তিনি বর্ণনা করেছেন দুঃস্বপ্নের মতো। বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে আইনজীবীর সহায়তায় লড়াই চালাতে হয়েছে তাকে।

নতুন চুক্তি, কড়া শর্ত
স্বত্ব ফিরে পাওয়ার পর তিনি নতুন করে তুরস্কের একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। এবার আর কোনো অগ্রিম নেননি, চিত্রনাট্য সম্পূর্ণ চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত চুক্তিও স্বাক্ষর করেননি। তার শর্ত ছিল স্পষ্ট—গল্পের পরিসমাপ্তি যেমন উপন্যাসে, তেমনই থাকবে; দ্বিতীয় মৌসুম হবে না।
প্রতিটি পর্বের খসড়া পড়ে সংশোধনী দিয়েছেন তিনি। চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজনা প্রধানের সঙ্গে বারবার বৈঠক করেছেন। সবশেষে নয়টি পর্বের প্রতিটি পাতায় স্বাক্ষর করে তবেই চুক্তি চূড়ান্ত করেন। চার বছর সময় নিয়ে নির্মিত হয়েছে ধারাবাহিকটি।
ইস্তাম্বুলের স্মৃতি, প্রেম ও আসক্তির কাহিনি
২০০৮ সালে প্রকাশিত ‘দ্য মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’ মূলত ইস্তাম্বুল শহরের পটভূমিতে রচিত এক বেদনাময় প্রেমকাহিনি। সচ্ছল যুবক কেমাল নিম্নবিত্ত বিক্রয়কর্মী ফুসুনের প্রেমে পড়েন। এই একতরফা, আসক্তিময় প্রেম তাকে বছরের পর বছর তাড়িয়ে বেড়ায়। প্রিয় মানুষকে ঘিরে দৈনন্দিন ছোট ছোট বস্তু সংগ্রহ করে তিনি একসময় সেগুলো জাদুঘরে প্রদর্শন করেন। সেখান থেকেই উপন্যাসের নাম।
২০১২ সালে ইস্তাম্বুলে বাস্তবেও ‘দ্য মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’ নামে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেন পামুক। উপন্যাসের নানা বস্তু সেখানে সংরক্ষিত আছে। ধারাবাহিকের কিছু দৃশ্যও ধারণ করা হয়েছে সেই জাদুঘরে।

নোবেলজয়ী লেখকের দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রা
১৯৫২ সালে জন্ম নেওয়া ওরহান পামুক তুরস্কের সবচেয়ে পরিচিত সাহিত্যিকদের একজন। ২০০৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। তার লেখায় তুরস্কের অটোমান অতীত, পাশ্চাত্যমুখী আকাঙ্ক্ষা এবং সাংস্কৃতিক টানাপোড়েনের অনন্য প্রতিফলন দেখা যায়।
ইস্তাম্বুল শহর তার রচনার কেন্দ্রে। শৈশবের স্মৃতি, চেনা গলি, হারিয়ে যাওয়া কাঠের বাড়ি—সবই উঠে আসে তার লেখায়। আধুনিকতার ঢেউয়ে বদলে যাওয়া প্রিয় পাড়াকে নিয়ে আক্ষেপও রয়েছে তার কণ্ঠে।
অভিনয়েও আত্মপ্রকাশ
এই ধারাবাহিক তাকে আরেকটি নতুন পরিচয় দিয়েছে। কয়েকটি দৃশ্যে তিনি নিজ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তবে এ বিষয়ে তার মন্তব্য, নিজেকে নিজে উপস্থাপন করাকে তিনি প্রকৃত অভিনয় বলতে চান না।
প্রযোজক জানিয়েছেন, লেখকের সন্তুষ্টিই ছিল সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি। সবকিছু মিলিয়ে নিজের শর্তে, নিজের গল্পকে অক্ষুণ্ন রেখেই এবার বৈশ্বিক দর্শকের সামনে এলেন নোবেলজয়ী এই সাহিত্যিক।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















