মার্কিন নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা ও আগুনঝরা বক্তা জেসি জ্যাকসন আর নেই। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তিনি শান্তিপূর্ণভাবে মারা গেছেন, তবে মৃত্যুর কারণ প্রকাশ করা হয়নি।
নাগরিক অধিকার আন্দোলনের উত্তরাধিকার
ষাটের দশকে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কিংবদন্তি নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র নিহত হওয়ার পর তাঁর আদর্শিক উত্তরসূরি হিসেবে উঠে আসেন জ্যাকসন। আবেগময় বক্তৃতা, “আশা বাঁচিয়ে রাখো” স্লোগান এবং বর্ণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানের কারণে তিনি দীর্ঘ সময় যুক্তরাষ্ট্রের কৃষ্ণাঙ্গ রাজনীতির মুখ হয়ে ছিলেন।
তিনি “রেইনবো কোয়ালিশন” ধারণার মাধ্যমে দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের বহুজাতিক রাজনৈতিক ঐক্যের কথা বলেন, যা পরবর্তী সময়ে ডেমোক্র্যাটিক রাজনীতির প্রগতিশীল ধারায় গভীর প্রভাব ফেলে।
শৈশব থেকে সংগ্রামের পথ
১৯৪১ সালের ৮ অক্টোবর দক্ষিণ ক্যারোলিনার গ্রিনভিলে জন্ম নেন জ্যাকসন। শৈশব থেকেই বর্ণবৈষম্যের তিক্ত অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক চেতনা গড়ে তোলে। কলেজজীবনে ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পর তিনি নাগরিক অধিকার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।
১৯৬৫ সালে আলাবামার সেলমায় কৃষ্ণাঙ্গ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ঘটনা তাঁকে পুরোপুরি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে। পরে তিনি কিংয়ের নেতৃত্বাধীন সংগঠনের সর্বকনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন।
জাতীয় রাজনীতিতে উত্থান
আন্দোলনের মাঠ ছাড়িয়ে জ্যাকসন জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনায় আসেন আশির দশকে। ১৯৮৪ সালে তিনি প্রথমবার ডেমোক্র্যাটিক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং উল্লেখযোগ্য ভোট পান। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনী লড়াইয়েও শক্ত অবস্থান তৈরি করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ রাজনীতির নতুন সম্ভাবনা দেখান।
তাঁর ৫০ মিনিটের সম্মেলন বক্তৃতা এবং “আশা বাঁচিয়ে রাখো” আহ্বান মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
বিতর্ক ও সমালোচনা
অসাধারণ জনপ্রিয়তার পাশাপাশি জ্যাকসনের রাজনৈতিক জীবন বিতর্কমুক্ত ছিল না। আত্মপ্রচারের প্রবণতা ও কিছু ব্যক্তিগত বিতর্কের কারণে সমর্থক ও সমালোচক—দুই পক্ষেরই সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। তবু সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে তাঁর অবস্থান তাঁকে দীর্ঘ সময় প্রভাবশালী নৈতিক কণ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
শেষ জীবন ও উত্তরাধিকার
দুর্লভ স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত হয়ে সাম্প্রতিক সময়ে তিনি অসুস্থ ছিলেন। জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি সামাজিক ন্যায়, ভোটাধিকার এবং বর্ণসমতার প্রশ্নে সক্রিয় ছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর আন্দোলনই পরবর্তী সময়ে কৃষ্ণাঙ্গ নেতৃত্বের উত্থানের পথ প্রশস্ত করেছে, যার ধারাবাহিকতায় এক সময় যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া সম্ভব হয়।
জ্যাকসন নিজেই একবার বলেছিলেন, তাঁর লক্ষ্য কেবল রাজনীতি নয়, বরং আমেরিকার মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো। সেই লক্ষ্য নিয়েই তিনি ইতিহাসে এক অমোচনীয় ছাপ রেখে গেলেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















