ওহাইও নদীর তীরঘেঁষা পুরোনো কয়লাখনি শহর হুইলিং—এখানে ঢোকার মহাসড়কের পাশে একটি বিলবোর্ডে ‘ব্ল্যাক লাং’ ক্লিনিকের বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। বহু বছর ভূগর্ভে কাজ করা শ্রমিকদের ফুসফুসের ক্ষতির স্মৃতি বহন করে এই দৃশ্য। দীর্ঘদিন ধরেই ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার পরিচিত চিত্র হলো কঠোর শ্রম, গ্রামীণ দারিদ্র্য এবং অসুস্থ জনসংখ্যা।
তবে জনস্বাস্থ্যের একটি সূচকে এই অঙ্গরাজ্য ব্যতিক্রমী অবস্থানে আছে। হাম, মাম্পস ও রুবেলা প্রতিরোধী এমএমআর টিকার ক্ষেত্রে এখানে শিশুদের টিকাদান প্রায় সর্বজনীন। পাশের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন কাউন্টিতে যেখানে টিকাদানের হার প্রায় ৯৩ শতাংশে ঘোরাফেরা করছে—যা গণরোগ প্রতিরোধের সীমার নিচে—সেখানে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া অনেক এগিয়ে। ২০২৫ সালে আশপাশের অঙ্গরাজ্যগুলোতে হাম ছড়িয়ে পড়লেও এখানে কোনো রোগী শনাক্ত হয়নি।
কঠোর নীতির কারণ
এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম কঠোর শিশু টিকা বাধ্যতামূলক নীতি। দেশজুড়ে মাত্র পাঁচটি অঙ্গরাজ্যে কেবল চিকিৎসাগত কারণেই টিকা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া তাদের একটি।

কিন্তু এই অবস্থান এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। চলতি গ্রীষ্মে অঙ্গরাজ্যের সর্বোচ্চ আদালত এমন একটি নির্বাহী আদেশের বৈধতা নিয়ে রায় দিতে পারে, যেখানে ধর্মীয় আপত্তিকেও টিকা অব্যাহতির আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যসচিব রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়র এই উদ্যোগকে সমর্থন দেওয়ায় বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষামূলক লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
রাজনীতিতে বদলে যাওয়া চিত্র
এক দশক আগে টিকা-বিরোধী মনোভাব রাজনৈতিকভাবে প্রায় সমানভাবে ছড়ানো ছিল। মহামারির পর সেই চিত্র বদলে গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যে টিকা নিয়ে দ্বিধা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ধর্মীয় বা দার্শনিক কারণে স্কুল টিকা থেকে অব্যাহতির আবেদনও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
গভর্নরের নির্দেশে নতুন বিতর্ক
গত বছর দায়িত্ব নেওয়ার দ্বিতীয় দিনেই গভর্নর প্যাট্রিক মরিসি একটি নির্বাহী আদেশে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও স্কুল প্রশাসকদের ধর্মীয় অব্যাহতি স্বীকৃতি দিতে নির্দেশ দেন। এর পরই বহু অভিভাবক আবেদন করতে শুরু করেন। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে অচিকিৎসাগত অব্যাহতির আবেদন শূন্য থেকে বেড়ে ৬৯৭-এ পৌঁছায়।

তবে দ্রুতই এই নির্দেশনা আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। সর্বোচ্চ আদালত মামলার শুনানি চলাকালে ধর্মীয় অব্যাহতি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। এখন পাঁচ বিচারপতির সিদ্ধান্তের ওপরই ঝুলে আছে অঙ্গরাজ্যের টিকা নীতির ভবিষ্যৎ।
কেন্দ্রের হস্তক্ষেপে নতুন মাত্রা
এই লড়াইকে আলাদা করেছে কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ। গত গ্রীষ্মে ফেডারেল স্বাস্থ্য বিভাগ ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে গভর্নরের আদেশকে সমর্থন জানায়। একই সঙ্গে সতর্ক করা হয়—ধর্মীয় অব্যাহতি সীমিত করা হলে দরিদ্র শিশুদের জন্য বিনামূল্যের টিকা কর্মসূচির অর্থায়ন ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
অঙ্গরাজ্যটিতে প্রায় অর্ধেক শিশু এই কর্মসূচির আওতায় পড়ে। ফলে অর্থায়ন হারানোর আশঙ্কা নীতিনির্ধারকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
আদালতের লড়াইয়ে প্রভাবশালী আইনজীবী
টিকা-বিরোধী মামলায় পরিচিত আইনজীবী অ্যারন সিরি এই মামলার প্রধান আইনজীবীদের একজন। তিনি আগে রবার্ট কেনেডির রাজনৈতিক প্রচারণাতেও উপদেষ্টা ছিলেন। একটি ফেডারেল টিকা উপদেষ্টা কমিটির সামনে তিনি বলেন, টিকাকে রাজনীতিমুক্ত করতে হলে বাধ্যতামূলক নীতি শেষ করতে হবে।

সম্ভাব্য প্রভাব কতটা বড়
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাধ্যতামূলক নীতি শিথিল হলে দ্রুত প্রভাব পড়তে পারে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রাথমিক টিকা গ্রহণে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ইতিমধ্যেই পিছিয়ে। ১৩ মাস বয়সে প্রায় অর্ধেক শিশু প্রথম এমএমআর ডোজ পায়, যেখানে ম্যাসাচুসেটসে এই হার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ।
তবে কিন্ডারগার্টেনে পৌঁছানোর সময় টিকাদানের হার দেশে শীর্ষে উঠে আসে, যা প্রমাণ করে বাধ্যতামূলক নীতি অনেক দ্বিধাগ্রস্ত অভিভাবককে শেষ পর্যন্ত টিকা দিতে বাধ্য করে।
জনমত ও রাজনৈতিক বার্তা
টিকা এখনো যুক্তরাষ্ট্রে সামগ্রিকভাবে জনপ্রিয়। তবু “মেক আমেরিকা হেলদি অ্যাগেইন” ধরনের স্লোগান কিছু মানুষের মধ্যে সাড়া ফেলছে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, রবার্ট কেনেডি জুনিয়রের নেট সমর্থন হার নেতিবাচক হলেও অন্যান্য শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের তুলনায় তুলনামূলক ভালো।
বিশ্লেষকদের মতে, এ কারণেই টিকা-বিরোধী বার্তা ছড়াতে তিনি কার্যকর মুখপাত্র হয়ে উঠছেন—বিশেষ করে হুইলিংয়ের মতো শহরগুলোতে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















