উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সম্মেলনের উদ্বোধনে জাতীয় অর্থনীতি ও আঞ্চলিক অবস্থানের উন্নতির প্রশংসা করেছেন। এই কংগ্রেসে তিনি আগামী পাঁচ বছরের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্র নীতির দিকনির্দেশনা দিতে পারেন এবং পারিবারিক শাসন আরও মজবুত করার পদক্ষেপ নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অর্থনীতিতে অগ্রগতির দাবি
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টির কংগ্রেস আগের দিন শুরু হয়েছে এবং উদ্বোধনী ভাষণে কিম মূলত অর্থনীতির ওপর জোর দেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে চলমান উত্তেজনা বা উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করেছেন কি না—সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
কিম বলেন, ২০২১ সালের শেষ কংগ্রেসের পর থেকে দেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তাঁর দাবি, অর্থনৈতিক উন্নতি এবং আঞ্চলিক অবস্থান শক্ত হওয়া রাষ্ট্রের মর্যাদাকে “অপরিবর্তনীয়ভাবে” শক্তিশালী করেছে।
তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতি সমাজতান্ত্রিক নির্মাণকে আরও এগিয়ে নেওয়ার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, অর্থনীতি শক্তিশালী করা, জনগণের জীবনমান উন্নত করা এবং রাষ্ট্র ও সমাজের সব ক্ষেত্রে দ্রুত পরিবর্তন আনা—দলের সামনে জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দায়িত্ব।

নীতিগত লক্ষ্য নির্ধারণের মঞ্চ
রাষ্ট্রীয় বার্তায় বলা হয়েছে, পিয়ংইয়ংয়ে অনুষ্ঠিত এই কংগ্রেসে আগামী কয়েক বছরের বড় নীতিগত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হবে এবং দলের সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে বিস্তারিত এজেন্ডা প্রকাশ করা হয়নি।
রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিম রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধকে কাজে লাগিয়ে নিজের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন এবং মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছেন। উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে সহায়তা দিতে হাজারো সৈন্য ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে বলে ধারণা করা হয়, যার বিনিময়ে তারা অর্থনৈতিক সহায়তা ও সামরিক প্রযুক্তি পেতে পারে।
এদিকে, ঐতিহ্যগত মিত্র চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক মজবুত করার চেষ্টা চলছে। গত বছর কিম বেইজিং সফর করেন এবং ছয় বছর পর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর প্রথম বৈঠক হয়।

অর্থনীতিতে ধীর পুনরুদ্ধারের আভাস
উত্তর কোরিয়ার কঠোর তথ্য নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রকৃত অর্থনৈতিক অবস্থা স্পষ্ট নয়। তবে বাইরের বিশ্লেষকদের মতে, দেশটি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে মহামারির পর চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং রাশিয়ায় অস্ত্র রপ্তানি অর্থনীতিকে কিছুটা চাঙ্গা করেছে।
কংগ্রেসে ব্যাপক অংশগ্রহণ
কয়েক দিনব্যাপী এই কংগ্রেসের আগে সপ্তাহজুড়ে কিম সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করেন এবং বিভিন্ন শিল্প ও আবাসন প্রকল্প পরিদর্শন করে গত পাঁচ বছরের সাফল্য তুলে ধরেন। কিমের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ হাজার প্রতিনিধি কংগ্রেসে অংশ নিচ্ছেন, যার মধ্যে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ২২৪ জন সদস্য রয়েছেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার নজরদারি
দক্ষিণ কোরিয়ার একীকরণ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র চ্যাং ইউন-জং জানান, উপস্থিতির সংখ্যা ২০২১ সালের কংগ্রেসের মতোই। সিউল ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে—এখানে আন্তঃকোরীয় সম্পর্ক বা বৃহত্তর পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত আসে কি না।
সম্ভাব্য পারমাণবিক ও উত্তরাধিকার বার্তা
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, কিম এই বৈঠকে নতুন অর্থনৈতিক লক্ষ্য ঘোষণা করার পাশাপাশি পারমাণবিক অস্ত্রসমৃদ্ধ সামরিক শক্তি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনাও তুলে ধরতে পারেন। ইতিমধ্যে উত্তর কোরিয়ার বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবস্থা এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু করতে সক্ষম এবং তাদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডেও পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা গত সপ্তাহে আইনপ্রণেতাদের জানায়, কিম তাঁর কিশোরী মেয়ে—সম্ভবত কিম জু অ্যে—কে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে তুলে ধরতে পারেন কি না, সে দিকেও নজর রাখা হচ্ছে। এটি হলে শাসনব্যবস্থার চতুর্থ প্রজন্মের উত্তরাধিকার আনুষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অচলাবস্থা
পিয়ংইয়ং ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক যোগাযোগ ২০১৯ সাল থেকে স্থবির হয়ে আছে। সে বছর কিম ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শীর্ষ বৈঠক ভেস্তে যাওয়ার পর এই অচলাবস্থা তৈরি হয়, যার মূল কারণ ছিল উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত মতবিরোধ।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র সংলাপের প্রস্তাব দিলেও উত্তর কোরিয়া তা প্রত্যাখ্যান করেছে। পিয়ংইয়ংয়ের শর্ত—আলোচনার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের দাবি প্রত্যাহার করতে হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি
কিম-ট্রাম্প সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে প্রায় সব ধরনের সংলাপ ও সহযোগিতা স্থগিত করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও খারাপ হয়েছে। কিম উত্তর কোরিয়ার দীর্ঘদিনের শান্তিপূর্ণ পুনর্মিলনের লক্ষ্য পরিত্যাগ করে কোরীয় উপদ্বীপে শত্রুভাবাপন্ন “দুই রাষ্ট্র” ব্যবস্থা ঘোষণা করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্টি কংগ্রেসে এই অবস্থান সাংবিধানিকভাবে আরও দৃঢ় করা হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















