যুক্তরাষ্ট্রের এক ফেডারেল বিচারক ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতিকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে বলেছেন, অবৈধভাবে বসবাসকারীদের গণহারে বহিষ্কারের প্রচেষ্টায় প্রশাসন আইনকে বেপরোয়া ভাবে লঙ্ঘন করেছে এবং অভিবাসীদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়েছে।
বুধবার গভীর রাতে দেওয়া এক কঠোর রায়ে বিচারক সানশাইন সাইকস মন্তব্য করেন, নির্বাহী বিভাগের পদক্ষেপকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই; এটি সামগ্রিকভাবে উদ্বেগজনক প্রবণতা নির্দেশ করে।
মিনেসোটায় দুই মার্কিন নাগরিক রেনে গুড ও অ্যালেক্স প্রেট্টির মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, হোয়াইট হাউস তাদের নীতির মাধ্যমে নিজেদের নাগরিকদের ওপরও সহিংসতার বিস্তার ঘটিয়েছে।

বিচারকের নির্দেশ ও আইনি লঙ্ঘনের অভিযোগ
বিচারক সাইকস জানান, তার গত ডিসেম্বরের রায় সত্ত্বেও প্রশাসন অনেক আটক অভিবাসীকে মুক্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে, যা বেআইনি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগকে নির্দেশ দেন, আটক ব্যক্তিদের জানাতে হবে যে তারা জামিনের জন্য যোগ্য হতে পারেন এবং এক ঘণ্টার মধ্যে আইনজীবীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের সুযোগ দিতে হবে।
এছাড়া প্রশাসন যে সেপ্টেম্বরের একটি অভিবাসন আদালতের রায়ের ওপর নির্ভর করে বাধ্যতামূলক আটক নীতি চালিয়ে যাচ্ছিল, সেটিও তিনি বাতিল করে দেন।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের দিকে নির্দেশ করে। বিভাগ এক বিবৃতিতে জানায়, বাধ্যতামূলক আটক ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্ট একাধিকবার নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত উল্টে দিয়েছে।
তাদের দাবি, ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিই আইন ও তথ্যের ভিত্তিতেই কাজ করছে এবং সর্বোচ্চ আদালত ভিন্ন সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত তারা আদালতের নির্দেশ মেনে চলে।

জামিন শুনানি বন্ধের প্রভাব
আগের প্রশাসনগুলোতে যেসব অভিবাসীর কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড ছিল না, তারা সাধারণত অভিবাসন বিচারকের কাছে জামিন শুনানির আবেদন করতে পারতেন, যদি না তারা সীমান্তে ধরা পড়তেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় এই প্রথা বদলে যায়।
জামিন শুনানির পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার অভিবাসী মুক্তির দাবিতে ফেডারেল আদালতে পৃথক আবেদন করেন। এপি-র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্পের অভিষেকের পর থেকে ২০ হাজারের বেশি হেবিয়াস কর্পাস মামলা দায়ের হয়েছে।
অনেক বিচারক এসব আবেদনে স্বস্তি দিলেও পরে দেখা যায়, প্রশাসন আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী বন্দিদের মুক্তি বা অন্যান্য সুবিধা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

অন্য আদালতের কঠোর অবস্থান
মিনেসোটার এক ফেডারেল বিচারক বুধবার এক বিরল পদক্ষেপে ট্রাম্প প্রশাসনের এক আইনজীবীকে আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন। অভিযোগ ছিল, আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও এক অভিবাসীর পরিচয়পত্র ফেরত দেয়নি সরকার।
এদিকে নিউ জার্সির এক ফেডারেল বিচারক এই সপ্তাহে প্রশাসনকে ব্যাখ্যা দিতে বলেন, কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে যে আদালতের নির্দেশসমূহ সময়মতো ও ধারাবাহিকভাবে মানা হচ্ছে। বিচারক মাইকেল ফারবিয়ার্জ জানান, ৫ ডিসেম্বরের পর থেকে প্রায় ৫৫০ মামলার মধ্যে ১২টিতে আদালত নির্ধারিত সময়ে জামিন শুনানি সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
তিনি লিখেছেন, বিচারিক নির্দেশ কখনোই লঙ্ঘন করা উচিত নয়।
বিচারকের কঠোর ভাষা
ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মনোনীত বিচারক সাইকস নভেম্বর ও ডিসেম্বর—দুই দফা রায়ে বলেন, বাধ্যতামূলক আটক নীতি কংগ্রেসের আইনের পরিপন্থী। তিনি তার সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে প্রযোজ্য করেন। তবুও রিপাবলিকান প্রশাসন জামিন শুনানি দেওয়া অব্যাহতভাবে অস্বীকার করে গেছে।
বুধবারের রায়ে সাইকস বলেন, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া থেকে অভিবাসীদের বঞ্চিত করা তাদের পরিবার, সম্প্রদায় এবং পুরো জাতির কাঠামোর জন্য ক্ষতিকর।
তিনি আরও বলেন, প্রশাসন যে দাবি করছে তারা কেবল সবচেয়ে বিপজ্জনক অপরাধীদের ধরছে—বাস্তবে গ্রেপ্তার হওয়া অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে তা সত্য নয়।

বাদীপক্ষের আইনজীবীর প্রতিক্রিয়া
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী ম্যাট অ্যাডামস আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বিচারকের সর্বশেষ রায় বাধ্যতামূলক আটক নীতির অবসান ঘটাতে পারে। তার মতে, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অভিবাসন বিচারকেরা আবার জামিন শুনানি দেওয়ার প্রথায় ফিরে যাবেন।
এই প্রতিবেদনে সিয়াটলের সিডার আত্তানাসিও এবং কেন্টাকির লুইসভিলের ক্লেয়ার গ্যালোফারো তথ্য সহযোগিতা করেছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















