তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ভেস্তে গেলে যুদ্ধের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে—এমন ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই। এ অবস্থায় রাশিয়ার সঙ্গে বার্ষিক সামরিক মহড়া চালিয়েছে ইরান, একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় একটি বিমানবাহী রণতরী। পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।
আলোচনায় অচলাবস্থা, বাড়ছে যুদ্ধের আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে ১০ থেকে ১৫ দিন “যথেষ্ট সময়”। তবে বছরের পর বছর ধরে আলোচনা অচল রয়েছে। ইরান এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সেই দাবি মানতে রাজি নয়, যেখানে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা বলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক পরোক্ষ আলোচনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষের কেউ বা উভয়ই হয়তো সম্ভাব্য সামরিক প্রস্তুতির জন্য সময় নিচ্ছে।
গত বছর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর পাশাপাশি জানুয়ারিতে বড় ধরনের সরকারবিরোধী বিক্ষোভও কঠোরভাবে দমন করা হয়, যা দেশটির শাসনব্যবস্থাকে আগের চেয়ে বেশি চাপের মুখে ফেলেছে।
জাতিসংঘে ইরানের কড়া বার্তা
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো এক চিঠিতে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি বলেছেন, তেহরান যুদ্ধ চায় না এবং যুদ্ধ শুরু করবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রাসন চালালে তার “দৃঢ় ও সমানুপাতিক” জবাব দেওয়া হবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এমন পরিস্থিতিতে অঞ্চলে থাকা শত্রুপক্ষের সব ঘাঁটি ও স্থাপনা ইরানের প্রতিরক্ষামূলক হামলার বৈধ লক্ষ্যবস্তু হবে।
এর আগে ইরান হরমুজ প্রণালিতে সরাসরি গোলাবর্ষণসহ সামরিক মহড়া চালায়। এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বাণিজ্যিক তেল পরিবাহিত হয়।

ইরানের ভেতরেও চাপ
দেশটির ভেতরেও উত্তেজনা বাড়ছে। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত বিক্ষোভকারীদের স্মরণে ৪০ দিনের শোকানুষ্ঠানে কোথাও কোথাও সরকারবিরোধী স্লোগান শোনা গেছে, যদিও কর্তৃপক্ষ কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি জোরদার
মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ভূমধ্যসাগরের মুখের দিকে অবস্থান করছে। অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ ও বিমান মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সক্ষমতা বাড়ালেও তাৎক্ষণিক হামলার নিশ্চয়তা দেয় না।
এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় “পূর্ণ শক্তি” মার্চের মাঝামাঝি নাগাদ প্রস্তুত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ইরান কবে লিখিত প্রস্তাব দেবে, সে বিষয়ে সময়সীমা জানানো হয়নি।
ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে অর্থবহ চুক্তি করা সহজ নয়। “আমাদের অর্থবহ চুক্তি করতেই হবে। না হলে খারাপ কিছু ঘটবে।”
আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতা
এক আঞ্চলিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ব্যক্তিগত আলোচনায় ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্পের বক্তব্যকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত। তিনি ইরানকে পরামর্শ দিয়েছেন, পারমাণবিক ইস্যুতে সমঝোতায় মনোযোগ দিলে দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব হতে পারে।
তবে সীমিত মার্কিন হামলা উল্টো ফল দিতে পারে এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি আলোচনাতেই সরে যেতে পারেন—এমন আশঙ্কাও তিনি জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক দেশটির নাগরিকদের দ্রুত ইরান ত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন, সতর্ক করে বলেছেন যে খুব শিগগিরই সরিয়ে নেওয়া অসম্ভব হয়ে যেতে পারে।
জার্মান সামরিক বাহিনীও উত্তর ইরাকের একটি ঘাঁটি থেকে অপ্রয়োজনীয় কর্মীদের সরিয়ে নিয়েছে, যদিও ইরবিলে প্রশিক্ষণ মিশন চালু রয়েছে।
রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের যৌথ মহড়া
ওমান উপসাগর ও ভারত মহাসাগরে ইরান ও রাশিয়ার নৌবাহিনী যৌথ মহড়া চালিয়েছে। তেহরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য, এর লক্ষ্য ছিল সামরিক সমন্বয় বাড়ানো ও অভিজ্ঞতা বিনিময়।
প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, ইরানের বিপ্লবী গার্ডের নৌ কমান্ডোরা মহড়ার অংশ হিসেবে একটি জাহাজে অভিযান চালাচ্ছে। অতীতে আন্তর্জাতিক জলপথে জাহাজ আটকাতেও এ বাহিনী ব্যবহৃত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
ইসরায়েলের পাল্টা হুঁশিয়ারি
সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েলও। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, যে কোনো পরিস্থিতির জন্য তারা প্রস্তুত।
তার ভাষায়, ইরান যদি ইসরায়েলে হামলা চালায়, তবে তারা এমন জবাব পাবে যা “কল্পনাও করতে পারবে না”।
নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর মার্কিন পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন। তার মতে, যে কোনো চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার সীমিত করা এবং হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নের শর্ত থাকতে হবে।

ইরানের অবস্থান অপরিবর্তিত
ইরান বলছে, বর্তমান আলোচনা শুধু তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েই হওয়া উচিত। তেহরানের দাবি, গত গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের সন্দেহ, ইরানের কর্মসূচির লক্ষ্য ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা। তবে তেহরান বরাবরই বলে আসছে তাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















