সংযুক্ত আরব আমিরাতে শিশুদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে সীমা টানার বিষয়ে জোরালো আলোচনা শুরু হয়েছে। নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের এক যৌথ আলোচনায় উঠে এসেছে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—শিশুরা কতক্ষণ অনলাইনে থাকে, সেটাই কি মূল সমস্যা, নাকি সমস্যার শিকড় আরও গভীরে?
ডিজিটাল নকশা ও শিশুমন
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সামাজিক মাধ্যমের নকশাই এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ব্যবহারকারীর মনোযোগ কেড়ে নেওয়া যায়। দ্রুত দৃশ্য পরিবর্তন, তীব্র উদ্দীপনা, নতুনত্ব এবং লাইক বা অবিরাম ভিডিওর মতো তাৎক্ষণিক পুরস্কার শিশুমস্তিষ্ককে ক্রমাগত উত্তেজনার সঙ্গে অভ্যস্ত করে তোলে।
শিশু ও কিশোর মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই বয়সে মস্তিষ্কের যে অংশ দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য দায়ী, তা এখনো পুরোপুরি বিকশিত হয় না। ফলে দ্রুতগতির কনটেন্টে অতিরিক্ত ডুবে থাকলে পড়াশোনা, বই পড়া বা শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ দেওয়ার মতো ধীর ও পরিশ্রমসাধ্য কাজ তাদের কাছে আকর্ষণহীন মনে হতে পারে।

স্কুল ও পরিবারে প্রভাব
স্কুলে এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে বাড়তি অমনোযোগ, একঘেয়েমি সহ্য করতে না পারা এবং পড়াশোনায় স্থায়ী মনোযোগের ঘাটতির মাধ্যমে। বাড়িতে অনেক অভিভাবক অভিযোগ করছেন, মোবাইল সরিয়ে নিলে শিশুরা খিটখিটে হয়ে ওঠে এবং অফলাইনে অন্য কাজে মন দিতে চায় না।
মনোবিজ্ঞানীরা আরও জানিয়েছেন, সামাজিক মাধ্যমে অতিরিক্ত নির্ভরতা উদ্বেগ, মেজাজের ওঠানামা এবং আচরণগত সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। সামাজিক মাধ্যম মস্তিষ্কের পুরস্কার ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে অল্প সময়ের জন্য স্বীকৃতির অনুভূতি দেয়। বারবার এই ডিজিটাল স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীলতা প্রশংসা ও সমালোচনার প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা তৈরি করতে পারে।

নয় থেকে চৌদ্দ বছর বয়স সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, নয় থেকে চৌদ্দ বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে। এ সময় পরিচয় গঠন এবং সমবয়সীদের স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়, কিন্তু আবেগ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা পুরোপুরি তৈরি হয় না। ফলে অনলাইনে নেতিবাচক অভিজ্ঞতা তাদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
ঘনঘন নোটিফিকেশন ও সামাজিক তুলনা শিশুর স্নায়ুতন্ত্রকে সব সময় সতর্ক অবস্থায় রাখে, যা ঘুম, মানসিক স্থিতি এবং সামগ্রিক সুস্থতায় প্রভাব ফেলে।
কী হতে পারে নিয়ন্ত্রণের পথ
নীতিনির্ধারকেরা ভাবছেন, বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক করা হবে কি না, স্কুল সময় ও ঘুমের সময় সুরক্ষিত রাখতে নির্দিষ্ট সময়সীমা আরোপ করা হবে কি না, নাকি দায়িত্ব আরও বেশি করে প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর দেওয়া হবে।
প্রযুক্তি খাতের একাধিক বিশেষজ্ঞের মতে, প্ল্যাটফর্মগুলোকেই প্রাথমিক দায়িত্ব নিতে হবে, কারণ তারাই অ্যালগরিদম ও সম্পৃক্ততার চক্র নকশা করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বয়স নির্ধারণ প্রযুক্তি ইতোমধ্যে বিদ্যমান, যা ছবি বিশ্লেষণের মাধ্যমে বয়সসীমা যাচাই করতে পারে এবং ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ না করেই ফলাফল জানাতে সক্ষম।
একই সঙ্গে জরিমানা, স্বচ্ছতা প্রতিবেদন এবং স্বাধীন প্রযুক্তিগত নিরীক্ষার মতো ব্যবস্থার কথাও আলোচনায় রয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও জাতীয় ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থা কার্যকর বাস্তবায়নের ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সচেতনতা ও পারিবারিক ভূমিকা
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন ও প্রযুক্তির পাশাপাশি সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখা, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, গোপনীয়তা সেটিংস সক্রিয় করা এবং পোস্ট দেওয়ার আগে ভেবে দেখা—এসব অভ্যাস ঝুঁকি অনেক কমাতে পারে।
অভিভাবকেরা সময়সীমা নির্ধারণ, নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট অনুমোদন এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে সহায়তা করতে পারেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল সময়সীমা চাপিয়ে দিলেই হবে না। খোলামেলা আলোচনা, বড়দের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত এবং সুষম দৈনন্দিন রুটিনের সমন্বয়ই বেশি কার্যকর।
আলোচনার কেন্দ্রে এখন একটি বড় প্রশ্ন—শিশুরা কতক্ষণ অনলাইনে থাকে, সেটি নয়; বরং ডিজিটাল পরিবেশ কীভাবে তৈরি হচ্ছে এবং সেই নকশা কি শিশুদের মনোযোগ, শেখা ও আবেগীয় বিকাশ রক্ষায় বদলানো দরকার?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















