লজিস্টিক জটিলতা কাটিয়ে অবশেষে আজ রাজধানীতে শুরু হচ্ছে অমর একুশে বইমেলা ২০২৬। দেশের সবচেয়ে বড় সাহিত্য সমাবেশকে ঘিরে আয়োজকদের প্রতিশ্রুতি এবার একেবারেই ভিন্ন মাত্রার—পরিবেশবান্ধব ও শূন্য বর্জ্যভিত্তিক মেলা। ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও একুশের আত্মাকে ধারণ করে মাসব্যাপী এই আয়োজন চলবে আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিকেল দুইটায় মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই মঞ্চে প্রদান করা হবে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫।

বহুমাত্রিক বাংলাদেশ: এবারের প্রতিপাদ্য
এবারের মেলার প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’। বাংলা একাডেমির আয়োজনে প্রতিবছরের মতো এবারও একুশের এই আয়োজন দেশের সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডারের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। ভাষা শহীদদের স্মরণ আর বাংলা ভাষার গৌরবকে ঘিরেই সাজানো হয়েছে পুরো মেলার আবহ।

পরিসর ও বিন্যাসে বড় আয়োজন
আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, এ বছর অংশ নিচ্ছে ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি স্টল থাকছে। সব মিলিয়ে মেলায় রয়েছে ১ হাজার ১৮টি ইউনিট।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চের পাশের গাছতলায় রাখা হয়েছে ছোটকাগজ চত্বর। সেখানে ৮৭টি ছোটকাগজের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে আলাদা স্টল। গত বছরের বিন্যাস মোটামুটি অপরিবর্তিত থাকলেও কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। মেট্রোরেল স্টেশনের অবস্থানের কারণে বের হওয়ার পথ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে মন্দির গেটের কাছাকাছি।
মেলায় প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য থাকবে চারটি পথ—টিএসসি, দোয়েল চত্বর, মেট্রোরেল বেসিং প্ল্যান্ট এলাকা এবং ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন সংলগ্ন অংশ। খাবারের স্টল রাখা হয়েছে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন এলাকার সীমানা ঘেঁষে।

রমজান উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন
রমজান মাস চলমান থাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে তারাবিহ নামাজের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নামাজের জায়গা, অজু ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে বাংলা একাডেমি।
সাধারণ দিনে মেলা খোলা থাকবে দুপুর দুইটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত, তবে সাড়ে আটটার পর প্রবেশ বন্ধ থাকবে। ছুটির দিনে সকাল এগারোটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত চলবে মেলা। শুক্র ও শনিবার সকাল এগারোটা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত থাকবে শিশু কর্নার। সেখানে ৬৩টি প্রতিষ্ঠান ১০৭টি ইউনিটে শিশুদের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
প্রতিদিন বিকেল তিনটা থেকে চারটা পর্যন্ত মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে সেমিনার। এরপর বিকেল চারটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শিশুদের চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতা এবং বই প্রকাশ অনুষ্ঠানও থাকবে মেলার নিয়মিত আয়োজনের অংশ হিসেবে।
শূন্য বর্জ্য মেলার প্রতিশ্রুতি
এবারের বড় ঘোষণা হলো শূন্য বর্জ্য বইমেলা গড়ে তোলা। পুরো মেলা প্রাঙ্গণ থাকবে পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত। ধুলা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত পানি ছিটানো হবে এবং মশা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।
প্রকাশক, খাবার বিক্রেতা ও স্টল পরিচালনাকারীদের পাট, কাপড় ও কাগজের মতো পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। ব্যানার, স্টল নির্মাণ ও প্রচারণায়ও পরিবেশ সচেতনতা বজায় রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তায় বহুস্তর ব্যবস্থা
মেলা প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় নেওয়া হয়েছে বহুস্তর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে বসানো হয়েছে তল্লাশি ফটক এবং পুরো এলাকাজুড়ে স্থাপন করা হয়েছে নজরদারি ক্যামেরা।
বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাব, আনসার ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবেন। দোয়েল চত্বর থেকে টিএসসি ও শাহবাগ, মৎস্য ভবন ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন এলাকা, দোয়েল চত্বর থেকে শহীদ মিনার ও চকবাজার, টিএসসি থেকে নীলক্ষেত—এসব পথেও বাড়তি আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা
সব প্রস্তুতি সত্ত্বেও রমজানে মেলা শুরুর কারণে কিছু প্রকাশক সময়মতো স্টল প্রস্তুত করতে হিমশিম খাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। উদ্বোধনের আগের দিনও কর্মীদের বই সাজানো ও ব্যানার টাঙাতে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। একাধিক প্রকাশকের মতে, প্রথম দিন সব স্টল পুরোপুরি প্রস্তুত নাও থাকতে পারে, আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পরও কিছু কাজ চলতে পারে।
তবু সব চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে আজ খুলছে অমর একুশে বইমেলার দুয়ার। ভাষার মাসে বইয়ের এই মহাউৎসব আবারও বইপ্রেমীদের মিলনমেলায় রূপ নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা আয়োজকদের।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















