আধুনিক মানুষের সরাসরি পূর্বপুরুষ হিসেবে বিবেচিত হোমো ইরেক্টাস প্রজাতি চীনে পূর্বে ধারণার চেয়ে অনেক আগেই পৌঁছেছিল—এমনটাই বলছে সাম্প্রতিক এক গবেষণা। এই আবিষ্কার প্রাথমিক মানব প্রজাতির বিশ্বজুড়ে বিস্তারের ইতিহাস নতুন করে লিখতে বাধ্য করতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
হুবেই প্রদেশে প্রাপ্ত জীবাশ্মের নতুন বিশ্লেষণ
চীনের বর্তমান হুবেই প্রদেশে আবিষ্কৃত হোমো ইরেক্টাসের জীবাশ্ম নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরীক্ষা করে গবেষকেরা দেখেছেন, সেগুলোর বয়স প্রায় ১৮ লাখ বছর। অর্থাৎ, পূর্বের হিসাবের তুলনায় প্রায় ছয় লাখ বছর আগেই এই প্রজাতি চীনে উপস্থিত ছিল।
এর ফলে ধারণা জোরদার হচ্ছে যে, আফ্রিকায় উৎপত্তির পর হোমো ইরেক্টাস খুব দ্রুত এবং সফলভাবে বিভিন্ন মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।
হোমো ইরেক্টাসের বিস্তারের সময়রেখা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
বিজ্ঞানীদের মতে, হোমো ইরেক্টাসের উৎপত্তি আফ্রিকায়। সেখান থেকে তারা ইউরেশিয়া জুড়ে বিস্তার লাভ করে। তবে পূর্ব এশিয়ায় ঠিক কখন তারা পৌঁছায়, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত সময়রেখা নির্ধারণ করা যায়নি।
সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রচলিত কার্বন-১৪ পদ্ধতির বদলে আরও উন্নত এক তারিখ নির্ধারণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা প্রায় ৫০ হাজার বছরের সীমা ছাড়িয়ে ৫০ লাখ বছর পর্যন্ত পুরোনো উপাদানের বয়স নির্ধারণ করতে সক্ষম।
এই গবেষণায় অংশ নেয় চীনের শানতোউ বিশ্ববিদ্যালয়, নানজিং নরমাল বিশ্ববিদ্যালয় ও শানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের পারডিউ বিশ্ববিদ্যালয় ও হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরাও। তাদের ফলাফল গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।
ইউনশিয়ান প্রত্নস্থলের গুরুত্ব
হান নদীর তীরে অবস্থিত ইউনশিয়ান প্রত্নস্থলে প্রথম প্রাণীর জীবাশ্ম পাওয়া যায় ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে। পরবর্তী কয়েক দশকে সেখানে তিনটি হোমিনিড খুলি উদ্ধার করা হয়।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, ইউনশিয়ানের হোমো ইরেক্টাস জীবাশ্মই পূর্ব এশিয়ায় এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ধারিত সবচেয়ে প্রাচীন মানব জীবাশ্ম।
বয়স নির্ধারণে নতুন পদ্ধতি
জীবাশ্মের বয়স নির্ধারণে গবেষকেরা মাটির নমুনায় অ্যালুমিনিয়াম-২৬ ও বেরিলিয়াম-১০ নামের তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ পরীক্ষা করেন। এই আইসোটোপগুলো সৃষ্টি হয় যখন মহাজাগতিক রশ্মি কোয়ার্টজ খনিজে আঘাত করে।
কোয়ার্টজ মাটি চাপা পড়ার পর আর নতুন আইসোটোপ তৈরি হয় না; বরং তখন থেকে তেজস্ক্রিয় ক্ষয় শুরু হয়। আইসোটোপের নির্দিষ্ট ক্ষয়ের হার এবং অবশিষ্ট অণুর অনুপাত বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নির্ধারণ করতে পারেন, জীবাশ্মটি ঠিক কখন মাটির নিচে চাপা পড়ে মহাজাগতিক রশ্মি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল।
আফ্রিকার বাইরে প্রাচীনতম স্থানের তুলনা
আফ্রিকার বাইরে হোমো ইরেক্টাসের সবচেয়ে পুরোনো নিদর্শন পাওয়া গেছে জর্জিয়ার দমানিসি অঞ্চলে। গবেষকেরা মনে করেন, সেটি সম্ভবত চীনের স্থানের চেয়ে সামান্য পুরোনো।
তাদের মতে, প্রায় ২০ লাখ বছর আগে আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে হোমো ইরেক্টাস দ্রুত এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল—এমন ধারণাকেই এই ফলাফল সমর্থন করে।
তবে এখনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে। হোমো ইরেক্টাস ঠিক কখন এবং কোথায় প্রথম আবির্ভূত হয়েছিল? চীনের প্রারম্ভিক প্লাইস্টোসিন যুগের কিছু স্থানে যে প্রাচীন মানব উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে, সেখানে কি তারাই প্রথম বসতি স্থাপনকারী ছিল?
উৎপত্তি আরও পেছাতে পারে?
গবেষণার সহ-লেখক, হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব অধ্যাপক ক্রিস্টোফার বে জানান, নির্ভরযোগ্য তারিখ নির্ধারণ পদ্ধতির অভাবেই এতদিন পূর্ব এশিয়ায় হোমো ইরেক্টাসের প্রথম উপস্থিতির সময় স্পষ্ট জানা যায়নি।
তিনি বলেন, প্রায় ১৯ লাখ বছর আগে আফ্রিকায় প্রথম দেখা দেওয়ার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তারা চীনে পৌঁছে যায়—এমনটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে তথ্য।
তবে বিকল্প ব্যাখ্যাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তার মতে, হোমো ইরেক্টাসের উৎপত্তিকাল আরও পেছিয়ে প্লিও-প্লাইস্টোসিন যুগের সন্ধিক্ষণ, অর্থাৎ প্রায় ২৬ লাখ বছর আগে পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করতে হবে।

প্রাথমিক মানব প্রজাতির মিশ্র বিবর্তন
বে আরও বলেন, প্রাথমিক মানব প্রজাতি বা উপপ্রজাতিগুলোর মধ্যে, যার মধ্যে হোমো ইরেক্টাসও রয়েছে, শুরুতে বেশ কিছু বৈশিষ্ট্যগত মিল ছিল। প্রায় ১৬ লাখ বছর আগে এসে আমরা তুলনামূলকভাবে সুস্পষ্ট ‘ইরেক্টাস’ বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই।
তার মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন হোমিনিন প্রজাতির মধ্যে যথেষ্ট ওভারল্যাপ বা মিল ছিল, যা মানব বিবর্তনের চিত্রকে আরও জটিল করে তোলে।
আউট অব আফ্রিকা মডেল পুনর্বিবেচনার আহ্বান
গবেষকেরা বলছেন, এই তত্ত্ব যাচাই করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে এমন অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে, যেগুলোর বয়স হোমো ইরেক্টাসের প্রচলিত উৎপত্তিকালের চেয়েও প্রাচীন।
এ কারণে ‘আউট অব আফ্রিকা ১’ মডেল নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। মানবজাতির প্রাচীন ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে এই আবিষ্কার তাই এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘোরানো অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















