০৪:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
শরীয়তপুরে রহস্যজনক বিস্ফোরণ, খেলতে গিয়ে শিশুর কবজি বিচ্ছিন্ন হাঁটার ছোট পরিবর্তনেই বড় স্বাস্থ্য উপকার, জানালেন বিশেষজ্ঞরা বিশ্বকাপ দেখতে চাইলে গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্ক, ক্ষোভ বাড়ছে সমর্থকদের ঈদের ভিড় কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল? ক্রেতাশূন্য ঢাকার বাজারে দোকানিদের দীর্ঘশ্বাস আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রাতারাতি বদলাবে না: পরিবেশমন্ত্রী চীন সফরে ট্রাম্প, বিশ্ব নেতৃত্বে পূর্বমুখী শক্তির উত্থানের বার্তা জিয়ার ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক বেতার ভাষণ জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছিল: ভারত কোরবানির হাটে হাসির বদলে হতাশা: খামারিদের লোকসান কি বদলে দেবে দেশের গবাদিপশু খাত? পলিমার্কেটে গোপন তথ্যের বাজি, গুগল প্রকৌশলীকে ঘিরে জালিয়াতির অভিযোগ নিষেধাজ্ঞার যুগে ইরানের তেল

কোরবানির হাটে হাসির বদলে হতাশা: খামারিদের লোকসান কি বদলে দেবে দেশের গবাদিপশু খাত?

কোরবানির ঈদ বাংলাদেশের লাখো গরুর খামারির জন্য বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। সারা বছর ধরে লালন-পালন করা গরু বিক্রি করে অনেকেই ঋণ শোধ করেন, সংসারের খরচ মেটান এবং পরবর্তী বছরের জন্য নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু এ বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক খামারি প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

খামারিদের অভিযোগ, গরুর খাদ্য, ওষুধ, শ্রমিকের মজুরি এবং পরিবহন খরচ গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় কোরবানির হাটে গরুর দাম বাড়েনি। অনেক ক্ষেত্রে খরচের তুলনায় লাভ তো দূরের কথা, মূলধনই পুরোপুরি ফেরত আসেনি।

গাজীপুর, কুষ্টিয়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, ঝিনাইদহসহ দেশের বিভিন্ন পশুপালন অঞ্চলে একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। ছোট ও মাঝারি খামারিরা সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন। অনেকেই শেষ পর্যন্ত কম দামে গরু বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন, কারণ ঈদের পর গরু ধরে রাখার খরচ আরও বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খামারিদের এই লোকসান শুধু একটি মৌসুমের সমস্যা নয়। এর প্রভাব আগামী কয়েক বছর পর্যন্ত দেশের গবাদিপশু খাতে পড়তে পারে। কারণ একজন খামারি যখন ধারাবাহিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েন, তখন তিনি পরবর্তী বছর কম পশু পালন করেন অথবা পুরো ব্যবসা থেকেই সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এর ফলে দেশে গবাদিপশুর উৎপাদন কমে যেতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ কোরবানির পশুর চাহিদার বড় অংশ নিজস্ব উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। এটি দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের একটি বড় অর্জন। কিন্তু খামারিরা যদি পর্যাপ্ত লাভ না পান, তাহলে এই স্বয়ংসম্পূর্ণতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুব উদ্যোক্তাদের আগ্রহ। গত এক দশকে বহু তরুণ খামার গড়ে তুলেছেন। তারা আধুনিক পদ্ধতিতে গরু পালন করে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু একের পর এক লোকসান হলে নতুন উদ্যোক্তারা এই খাতে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।

লোকসানের প্রভাব শুধু খামারিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে পশুখাদ্য শিল্প, ওষুধ কোম্পানি, পরিবহন খাত, হাট ব্যবস্থাপনা এবং হাজার হাজার শ্রমিক। ফলে গবাদিপশু খাতের দুর্বলতা গ্রামীণ অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

খামারিরা বলছেন, বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, পশু পরিবহনের খরচ কমানো, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে অনলাইন ও আধুনিক পশু বিপণন ব্যবস্থার প্রসার ঘটালে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো সম্ভব হবে।

কোরবানির ঈদ শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বড় চালিকাশক্তি। তাই খামারিদের বর্তমান সংকটকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আজকের লোকসান যদি আগামী বছরের বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়, তাহলে তার প্রভাব পড়বে দেশের মাংস উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর।

কোরবানির হাটে এ বছরের হতাশা তাই শুধু কয়েকজন খামারির ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এটি দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্নও তুলে দিচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

শরীয়তপুরে রহস্যজনক বিস্ফোরণ, খেলতে গিয়ে শিশুর কবজি বিচ্ছিন্ন

কোরবানির হাটে হাসির বদলে হতাশা: খামারিদের লোকসান কি বদলে দেবে দেশের গবাদিপশু খাত?

০২:৩৬:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬

কোরবানির ঈদ বাংলাদেশের লাখো গরুর খামারির জন্য বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। সারা বছর ধরে লালন-পালন করা গরু বিক্রি করে অনেকেই ঋণ শোধ করেন, সংসারের খরচ মেটান এবং পরবর্তী বছরের জন্য নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু এ বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক খামারি প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

খামারিদের অভিযোগ, গরুর খাদ্য, ওষুধ, শ্রমিকের মজুরি এবং পরিবহন খরচ গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় কোরবানির হাটে গরুর দাম বাড়েনি। অনেক ক্ষেত্রে খরচের তুলনায় লাভ তো দূরের কথা, মূলধনই পুরোপুরি ফেরত আসেনি।

গাজীপুর, কুষ্টিয়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, ঝিনাইদহসহ দেশের বিভিন্ন পশুপালন অঞ্চলে একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। ছোট ও মাঝারি খামারিরা সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন। অনেকেই শেষ পর্যন্ত কম দামে গরু বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন, কারণ ঈদের পর গরু ধরে রাখার খরচ আরও বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খামারিদের এই লোকসান শুধু একটি মৌসুমের সমস্যা নয়। এর প্রভাব আগামী কয়েক বছর পর্যন্ত দেশের গবাদিপশু খাতে পড়তে পারে। কারণ একজন খামারি যখন ধারাবাহিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েন, তখন তিনি পরবর্তী বছর কম পশু পালন করেন অথবা পুরো ব্যবসা থেকেই সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এর ফলে দেশে গবাদিপশুর উৎপাদন কমে যেতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ কোরবানির পশুর চাহিদার বড় অংশ নিজস্ব উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। এটি দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের একটি বড় অর্জন। কিন্তু খামারিরা যদি পর্যাপ্ত লাভ না পান, তাহলে এই স্বয়ংসম্পূর্ণতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুব উদ্যোক্তাদের আগ্রহ। গত এক দশকে বহু তরুণ খামার গড়ে তুলেছেন। তারা আধুনিক পদ্ধতিতে গরু পালন করে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু একের পর এক লোকসান হলে নতুন উদ্যোক্তারা এই খাতে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।

লোকসানের প্রভাব শুধু খামারিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে পশুখাদ্য শিল্প, ওষুধ কোম্পানি, পরিবহন খাত, হাট ব্যবস্থাপনা এবং হাজার হাজার শ্রমিক। ফলে গবাদিপশু খাতের দুর্বলতা গ্রামীণ অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

খামারিরা বলছেন, বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, পশু পরিবহনের খরচ কমানো, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে অনলাইন ও আধুনিক পশু বিপণন ব্যবস্থার প্রসার ঘটালে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো সম্ভব হবে।

কোরবানির ঈদ শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বড় চালিকাশক্তি। তাই খামারিদের বর্তমান সংকটকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আজকের লোকসান যদি আগামী বছরের বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়, তাহলে তার প্রভাব পড়বে দেশের মাংস উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর।

কোরবানির হাটে এ বছরের হতাশা তাই শুধু কয়েকজন খামারির ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এটি দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্নও তুলে দিচ্ছে।