ঈদুল আজহা ঘিরে প্রতি বছরই রাজধানী ঢাকার ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের বিক্রির আশা করেছিলেন। নতুন পণ্য তুলেছিলেন, দোকান সাজিয়েছিলেন, অতিরিক্ত কর্মচারী নিয়োগ করেছিলেন অনেকেই। কিন্তু সদ্য শেষ হওয়া ঈদ মৌসুমে তাদের সেই প্রত্যাশার বড় অংশই অপূর্ণ থেকে গিয়েছিল। রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেট ও শপিং সেন্টারে ক্রেতাদের উপস্থিতি থাকলেও বিক্রি আশানুরূপ হয়নি।
নিউ মার্কেট, গাউছিয়া, চাঁদনী চক, বসুন্ধরা সিটি, মিরপুর ও উত্তরার মতো বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে ব্যবসায়ীরা এক ধরনের হতাশার কথাই জানিয়েছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, মানুষ বাজারে এসেছিলেন, ঘুরে দেখেছিলেন, কিন্তু আগের মতো কেনাকাটা করেননি। ফলে দোকানে ভিড় থাকলেও নগদ বিক্রির হিসাব ছিল অনেকটাই হতাশাজনক।
এই পরিস্থিতির পেছনে অন্যতম কারণ ছিল মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর অর্থনৈতিক চাপ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় অধিকাংশ পরিবার তাদের ব্যয়ের তালিকায় পরিবর্তন এনেছিল। খাদ্য, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য জরুরি খরচ মেটানোর পর উৎসবের কেনাকাটার জন্য অনেকের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ অবশিষ্ট থাকেনি। ফলে নতুন পোশাক, জুতা কিংবা ফ্যাশনসামগ্রী কেনার প্রবণতা কমে গিয়েছিল।
কোরবানির পশু কেনার ব্যয়ও পরিবারগুলোর বাজেটে বড় প্রভাব ফেলেছিল। অনেকেই কোরবানির খরচকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। ফলে পোশাক ও অন্যান্য পণ্যের জন্য আলাদা বাজেট সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। ব্যবসায়ীরা বলেছিলেন, কোরবানির ঈদে সাধারণত কেনাকাটা কিছুটা কম হয়, তবে এবার সেই প্রভাব ছিল আরও বেশি।
একই সময়ে অনলাইন বাণিজ্যের প্রসারও প্রচলিত দোকানগুলোর বিক্রিকে প্রভাবিত করেছিল। বিপুলসংখ্যক ক্রেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কেনাকাটা করেছিলেন। ঘরে বসে পণ্য দেখা, মূল্য তুলনা করা এবং দ্রুত ডেলিভারির সুবিধা পাওয়ায় অনেকেই সরাসরি বাজারে যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেননি।
ঢাকার দীর্ঘ যানজটও ব্যবসায়ীদের জন্য আরেকটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ঈদের আগে শহরের সড়কগুলোতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। অনেক পরিবার বাজারে যাওয়ার পরিকল্পনা করলেও যানজট ও পার্কিং সমস্যার কারণে শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করেছিলেন। ফলে প্রত্যাশিত সংখ্যক ক্রেতা দোকানে পৌঁছাননি।
এছাড়া ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার আগেই বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন। সাধারণত শেষ মুহূর্তের কেনাকাটার ওপর অনেক ব্যবসায়ী নির্ভর করে থাকেন। কিন্তু এবার সেই ক্রেতাদের একটি বড় অংশ রাজধানীতে অবস্থান করেননি। এতে বাজারে বিক্রির সুযোগ আরও কমে গিয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোক্তাদের আচরণেও পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। আগে ঈদ উপলক্ষে একাধিক পোশাক, উপহার ও বিলাসী কেনাকাটার প্রবণতা থাকলেও এবার অনেকেই সঞ্চয়কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ তাদের ব্যয়ের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক করে তুলেছিল।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। বড় ব্র্যান্ডগুলো কিছুটা হলেও পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছিল, কিন্তু ছোট দোকানগুলোর অনেকেই প্রত্যাশিত বিক্রি থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। তাদের জন্য ঈদ মৌসুমের আয় ছিল সারা বছরের ব্যবসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই আয় কমে যাওয়ায় দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য ব্যয় মেটানো নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
ঈদের সময় ঢাকার বাজারগুলো আলোয় ঝলমল করেছিল, দোকানগুলো সেজেছিল উৎসবের সাজে। কিন্তু সেই বাহ্যিক আয়োজনের আড়ালে লুকিয়ে ছিল ব্যবসায়ীদের হতাশা। কারণ প্রত্যাশিত ক্রেতা না পাওয়ার ফলে অনেক দোকানিই মৌসুম শেষে বিক্রির হিসাব মেলাতে পারেননি।
সদ্য সমাপ্ত ঈদুল আজহার এই অভিজ্ঞতা শুধু একটি দুর্বল বাণিজ্য মৌসুমের গল্প ছিল না; এটি নগর অর্থনীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং পরিবর্তিত ভোক্তা আচরণের একটি বাস্তব চিত্রও তুলে ধরেছিল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















