বিশ্বজুড়ে মানুষ আজ একই অভিযোগ করছে—বাজারে গেলে খরচ বেড়েছে, পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, বিদ্যুৎ ও গৃহস্থালি ব্যয়ও আগের তুলনায় অনেক বেশি। সাধারণ ব্যাখ্যা হলো, আমরা একটি ‘জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট’-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু এই ব্যাখ্যা বাস্তব সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে আড়াল করে রাখে।
প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি জীবনযাপনই এত ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে, নাকি আমাদের অর্থনীতি এমন এক জ্বালানি কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা বারবার বিশ্বকে মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় ফেলছে?
বিশ্ব অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে তেল ও গ্যাসের গভীর উপস্থিতি আজকের সংকটকে বোঝার মূল চাবিকাঠি। বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শিল্পকারখানা, পরিবহন থেকে কৃষি—প্রায় সব ক্ষেত্রেই জীবাশ্ম জ্বালানি প্রধান শক্তির উৎস। ফলে ভূরাজনৈতিক কোনো সংঘাত দেখা দিলেই তার অভিঘাত সরাসরি বাজারে এসে পড়ে।
গত কয়েক বছরে বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাত এই বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। যুদ্ধ বা আঞ্চলিক উত্তেজনা যখন তেল ও গ্যাস সরবরাহকে অনিশ্চিত করে তোলে, তখন শুধু জ্বালানির দামই বাড়ে না; খাদ্য, পরিবহন, উৎপাদন এবং দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্যের খরচও বেড়ে যায়। অর্থাৎ মানুষ যে মূল্যস্ফীতির মুখোমুখি হচ্ছে, তার পেছনে অনেক ক্ষেত্রে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতাই প্রধান চালিকা শক্তি।
খাদ্য খাত এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা এখন এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে সার উৎপাদন, কৃষিযন্ত্র পরিচালনা, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ ও পরিবহন—সবকিছুর সঙ্গে জ্বালানির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। ফলে তেলের মূল্য বৃদ্ধি মানেই খাদ্য উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার থালায় এসে পৌঁছায়।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী। উন্নয়নশীল দেশগুলোর বহু পরিবার আয়ের বড় অংশ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করে। তাই খাদ্যের দাম সামান্য বাড়লেও তাদের জীবনযাত্রায় বড় চাপ তৈরি হয়। উচ্চ আয়ের দেশগুলো যেখানে মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা তুলনামূলক সহজে সামলাতে পারে, সেখানে দরিদ্র অর্থনীতির মানুষের জন্য এটি সরাসরি জীবনমানের অবনতি ডেকে আনে।
এই পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে: আমরা কি কেবল সংঘাত শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকব, নাকি সমস্যার মূল কারণ মোকাবিলা করব?
অবশ্যই যুদ্ধ বন্ধ হওয়া এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসা জরুরি। কিন্তু সেটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। কারণ নতুন কোনো সংঘাত, নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা বা সরবরাহ সংকট আবারও একই চক্র শুরু করতে পারে। যতদিন অর্থনীতি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল থাকবে, ততদিন বৈশ্বিক বাজার এই ঝুঁকি থেকে মুক্ত হবে না।
এই কারণেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি শুধু পরিবেশগত প্রয়োজন নয়; এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও প্রশ্ন। সূর্য, বাতাস বা অন্যান্য পুনর্নবীকরণযোগ্য উৎস কোনো নির্দিষ্ট দেশের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এগুলোর সরবরাহকে ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এগুলো একটি বেশি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।
অবশ্য রূপান্তরটি সহজ হবে না। শিল্প উৎপাদনের বহু ক্ষেত্র এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। অনেক দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও দ্রুত পরিবর্তনের পক্ষে নয়। তবে বাস্তবতা হলো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির ব্যয় দ্রুত কমছে এবং নতুন প্রকল্পগুলোর বড় অংশই ইতোমধ্যে প্রচলিত জীবাশ্মভিত্তিক বিকল্পের তুলনায় বেশি প্রতিযোগিতামূলক।
শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, বিদ্যুৎ সঞ্চয় প্রযুক্তি, স্মার্ট গ্রিড এবং আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরিষ্কার জ্বালানি উৎপাদন করলেই হবে না; সেটি দক্ষতার সঙ্গে ঘর, কারখানা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে।
বিশ্বের অনেক উদীয়মান অর্থনীতি ইতোমধ্যে এই পথে হাঁটছে। তাদের লক্ষ্য শুধু কার্বন নিঃসরণ কমানো নয়; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে এমন এক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো, যা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কাছে বারবার জিম্মি হবে না।
ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা তাই কেবল উৎপাদনের প্রশ্ন নয়, নিয়ন্ত্রণেরও প্রশ্ন। যে দেশ নিজের জ্বালানির বড় অংশ নিজেই উৎপাদন করতে পারবে, সে দেশ বৈশ্বিক সংকটের সময় তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল থাকবে। সেই অর্থে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ জলবায়ু নীতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক কৌশলও।
বিশ্ব যদি সত্যিই মূল্যস্ফীতির পুনরাবৃত্ত ধাক্কা থেকে মুক্তি চায়, তাহলে সমস্যাকে সঠিক নামে চিহ্নিত করতে হবে। এটি শুধু জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট নয়; এটি মূলত জ্বালানি নির্ভরতার সংকট। আর সেই নির্ভরতা কমাতে পারলেই মূল্য স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির নতুন পথ উন্মুক্ত হতে পারে।
মূল লেখক: উওচং উম (Woochong Um), প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, গ্লোবাল এনার্জি অ্যালায়েন্স ফর পিপল অ্যান্ড প্ল্যানেট; সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক।
উওচং উম 


















