গুরুগ্রামের বিস্তীর্ণ প্রযুক্তি উপশহরে কৃষ্ণ খান্ডেলওয়াল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এমন এক চ্যাটবট বাহিনী তৈরি করছেন, যা এক সময় ভারতের দ্রুত উত্থানশীল অর্থনীতিকে শক্তি জোগানো অসংখ্য সাদা-কলার চাকরিকে অপ্রয়োজনীয় করে দিতে পারে।
গত গ্রীষ্ম থেকে তাঁর স্টার্টআপ হুনার.এআই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষভাবে তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভয়েস এজেন্ট সরবরাহ করছে। এই এজেন্টরা জীবনবৃত্তান্ত বাছাই থেকে শুরু করে নিয়োগ-পরবর্তী প্রশিক্ষণ পর্যন্ত প্রায় পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াই সামলাতে পারে। কোম্পানির শেয়ার্ড ওয়ার্কস্পেসে বসে তিনি বলেন, অনবোর্ডিংয়ের জন্য মানুষের প্রয়োজন প্রায় নেই বললেই চলে।
পঁচিশ বছর ধরে ভারত নিজেকে বিশ্বের ব্যাক অফিস হিসেবে গড়ে তুলেছে। ইংরেজি জানা শিক্ষিত কর্মী বাহিনী ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের তুলনায় কম খরচে নানা দাপ্তরিক কাজ সম্পন্ন করেছে দেশটি। বর্তমানে এই খাতে ছয় মিলিয়নের বেশি মানুষ কাজ করেন এবং শিল্পটির আকার প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের সাত শতাংশেরও বেশি।

এখন সেই মডেলই হুমকির মুখে। যেমন এক সময় আউটসোর্সিং বিশ্বজুড়ে বহু চাকরি সরিয়ে নিয়েছিল, তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভারতে শত সহস্র অফিসকর্মীর কাজ প্রতিস্থাপন করতে পারে।
বিশ্বজুড়ে অর্থনীতিগুলো এমন এক সময়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পুরো সাদা-কলার কাজের বিভাগকে স্বয়ংক্রিয় করে দেবে। তবে এর সবচেয়ে বড় ধাক্কা ভারতে লাগতে পারে, যেখানে দুই দশকের প্রচেষ্টায় বৈশ্বিক প্রযুক্তি মানচিত্রে নিজেদের অবস্থান তৈরি করা হয়েছে।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান মেনলো ভেঞ্চারসের অংশীদার ডিডি দাস বলেন, সময়ের ব্যাপার মাত্র। কোনো কাজ যদি আরও কম খরচে করার প্রযুক্তি তৈরি হয়, বাজার সেটি গ্রহণ করবেই। তাঁর মতে, এই পরিবর্তন দ্রুত ঘটবে।
প্রভাব ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস তাদের কর্মীসংখ্যা কমিয়ে ৫ লাখ ৮০ হাজারে এনেছে, যা ২০২২ সালের শীর্ষ পর্যায়ের তুলনায় ২০ হাজারেরও বেশি কম। প্রতিদ্বন্দ্বী ইনফোসিসও নিয়োগের গতি কমিয়েছে। ২০২৫ সালে বহু ছোট স্টার্টআপ কর্মী ছাঁটাই করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তি কলেজের স্নাতকেরা এখন আগের তুলনায় কম চাকরির সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে অনেকে নতুন দক্ষতা অর্জনে ঝুঁকছেন, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি শেখার দিকে।
এ বছরের শুরুতে প্রযুক্তি শেয়ার দরপতনের মধ্যেই একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়, ২০২৮ সালের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোডিং এজেন্টের প্রান্তিক খরচ প্রায় বিদ্যুতের দামে নেমে আসতে পারে। এতে ভারতের ঐতিহ্যগত খরচ-সুবিধা মডেল বড় ধাক্কা খাবে।
২০১৪ সাল থেকে দায়িত্বে থাকা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই চ্যালেঞ্জ স্বীকার করেছেন। তিনি দেশকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত করার অঙ্গীকার করেছেন এবং সফটওয়্যার প্রকৌশলীদের নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও রপ্তানির আহ্বান জানিয়েছেন। সাম্প্রতিক এক সম্মেলনে তিনি বলেন, ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত পুরো সভ্যতার গতিপথ বদলে দেয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তেমনই এক পরিবর্তন।
তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে, ভারত কি এই রূপান্তরের জন্য প্রস্তুত। দেশটির দক্ষ মানবসম্পদ থাকলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পণ্য চালাতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও প্রাকৃতিক সম্পদে ঘাটতি রয়েছে।
সাম্প্রতিক সম্মেলনে ভারতের বড় আউটসোর্সিং সংস্থাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির ঘোষণা দিয়েছে, যাতে তাদের পণ্য ব্যবহার ও ডেটা সেন্টার সক্ষমতা বাড়ানো যায়। যদিও এটি বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে স্বাগত, তবুও মাইক্রোচিপ থেকে মৌলিক মডেল পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা স্পষ্ট।
রাজনৈতিক প্রভাবও পড়তে পারে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে শাসক দল আসন হারিয়েছে। শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ২০২২ সালে মোট বেকারের ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায় বলে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রায় দেড় বিলিয়ন মানুষের দেশে ছয় মিলিয়ন প্রযুক্তি কর্মী সংখ্যায় কম মনে হলেও, তারা প্রভাবশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেন, যারা বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ ও পুনের মতো শহরে কেন্দ্রীভূত।
ন্যাসকমের সভাপতি রাজেশ নাম্বিয়ার বলেন, সদ্য স্নাতক প্রকৌশলীদের জন্য সময়টা সহজ হবে না।
তবে সবাই হতাশ নন। অনেকের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন স্টার্টআপেরও জন্ম দিচ্ছে। বেঙ্গালুরুভিত্তিক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান লাইমচ্যাটের সহপ্রতিষ্ঠাতা নিখিল গুপ্ত বলেন, ভারত বিশ্বকে সেবা দেওয়ার সব উপাদানই ধারণ করে।
ভারতের বড় আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানগুলো বহুজাতিক সংস্থার সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক ও জটিল সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনার দক্ষতার কারণে একদিনে হারিয়ে যাবে না। তারা ইতিমধ্যে কল সেন্টারের বাইরে মানবসম্পদ ও হিসাবরক্ষণ সেবাও দিচ্ছে। অনেক আন্তর্জাতিক কোম্পানি ভারতে নিজস্ব গ্লোবাল সক্ষমতা কেন্দ্রও খুলেছে।
টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেসের প্রধান নির্বাহী কে. কৃতিবাসন জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি সেবায় বিশ্বনেতা হতে চায়। সাম্প্রতিক প্রান্তিকে তাদের এআই সেবার বার্ষিক আয় ১.৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
তবে বাস্তব চিত্র কঠিন। কল সেন্টার ও ব্যাক অফিসে নিয়োগ প্রায় থমকে গেছে। নতুন যে কাজ তৈরি হচ্ছে, যেমন ডেটা লেবেলিং বা রোবট প্রশিক্ষণ, তা একঘেয়ে, কম বেতনের এবং উন্নতির সুযোগ সীমিত।

বিশ্লেষকদের মতে, এখন অনেক তরুণ স্নাতক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে পণ্য সরবরাহ করে আগের এন্ট্রি-লেভেল প্রযুক্তি চাকরির চেয়ে বেশি আয় করছেন। কিন্তু সামাজিক প্রত্যাশা এখনো বদলায়নি।
গাজিয়াবাদের আর.ডি. ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে আগে টাটা বা ইনফোসিসের মতো সংস্থাগুলো নিয়োগের জন্য আসত। এখন কলেজকেই সংস্থার দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। কয়েক বছর আগে যেখানে ৮৫ শতাংশ স্নাতক পাসের সঙ্গে সঙ্গে চাকরি পেতেন, এখন তা নেমে এসেছে ৭৫ শতাংশে।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান সেখানে ১০ দিনের প্রশিক্ষণ দেয়। প্রায় ১০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন চাকরি পান। এক শিক্ষার্থী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবসার মডেল বদলে দিয়েছে।
কলেজ কর্তৃপক্ষ পাঠ্যক্রম দ্রুত হালনাগাদ করার চেষ্টা করছে। তাদের লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের উপযোগী করে তোলা।

হুনার.এআই সম্ভাবনা ও বিপর্যয়ের দুই দিকই দেখায়। আগে প্রতিষ্ঠানটিতে ৬৫ জন কর্মী ফোনকল সামলাতেন। এখন চ্যাটবট প্রশিক্ষণের পর সেই সংখ্যা কমে ৪৫। ভবিষ্যতে তা ২৫ বা তারও কমে নামতে পারে, যদিও ব্যবসা বাড়ছে।
প্রতিষ্ঠাতা কৃষ্ণ খান্ডেলওয়াল জানান, তাঁদের প্রযুক্তি ইতিমধ্যে প্রায় এক হাজার মানবসম্পদ সংক্রান্ত চাকরি অপ্রয়োজনীয় করেছে। বছরের শেষে তারা দশ হাজার মানুষের কাজের সমপরিমাণ কাজ করতে পারবে বলে তাঁর দাবি।
এই রূপান্তর ভারতের প্রযুক্তি অর্থনীতির জন্য এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















