মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব এখন ইরান-তুরস্ক স্থলসীমান্তে। ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খয় সীমান্ত গেট দিয়ে তুরস্কে প্রবেশ করতে গিয়ে বহু ইরানি নাগরিক আটকে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন কয়েকজন ভ্রমণকারী। সীমান্তের ইরানি অংশে অনিশ্চয়তা ও অপেক্ষার দৃশ্য তৈরি হয়েছে। তবে তুরস্কের ভান প্রদেশের কাপিকয় সীমান্ত পয়েন্টে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে শান্ত ও স্বাভাবিক রয়েছে।
কী ঘটছে খয় সীমান্তে
রোববার যারা ইরান থেকে তুরস্কে প্রবেশ করেছেন, তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খয় গেট দিয়ে ইরানি নাগরিকদের দেশ ছাড়তে বাধা দেওয়া হচ্ছে। অনেকে সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে অপেক্ষা করছেন শত শত মানুষ। তাঁদের পাশে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে আছে ব্যক্তিগত গাড়ি ও যাত্রীবাহী যানবাহন।
তুরস্কে পৌঁছানো এক যাত্রী জানান, তিনি সীমান্ত পার হওয়ার সময় ইরান অংশে অন্তত তিন থেকে চারশ মানুষ অপেক্ষা করতে দেখেছেন। তবে কেন তাঁদের আটকে রাখা হচ্ছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। সীমান্ত কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকেও নির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

প্রযুক্তিগত সমস্যার দাবি
আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ইরানি নাগরিকদের বলা হচ্ছিল সীমান্ত ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত সমস্যা রয়েছে। তাঁদের ভাষায়, “সিস্টেম বন্ধ” থাকার কারণে স্বাভাবিক পাসপোর্ট যাচাই সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে কিছু ক্ষেত্রে হাতে-কলমে পাসপোর্ট পরীক্ষা করা হচ্ছিল। তবে তিনি বলেন, তাঁর চোখে খুব বড় ধরনের ভিড় পড়েনি, যদিও প্রক্রিয়া ছিল ধীরগতির।
এই ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যের কারণে সীমান্তের প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। কতজন মানুষ আটকে আছেন, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তুরস্ক ও ইরানের আনুষ্ঠানিক অবস্থান
তুরস্কের কর্তৃপক্ষ এবং আঙ্কারায় ইরানের দূতাবাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে থাকা তিনটি স্থলসীমান্ত পয়েন্টই খোলা রয়েছে। নাগরিকরা নিজ নিজ দেশে ফিরতে পারছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে স্থানীয় একটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সীমান্ত পারাপারে একটি বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তুরস্কে প্রবেশের ক্ষেত্রে কেবল তুর্কি নাগরিকদের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে এবং তুরস্ক থেকে ইরানে ফেরার ক্ষেত্রে কেবল ইরানি নাগরিকদের যেতে দেওয়া হচ্ছে। এই তথ্য নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা মেলেনি।
কাপিকয়ে স্বাভাবিক দৃশ্য
তুরস্কের ভান প্রদেশে অবস্থিত কাপিকয় সীমান্ত চৌকিতে সপ্তাহান্তে যানবাহন ও যাত্রী চলাচল স্বাভাবিক ছিল। বড় ধরনের ভিড় বা বিশৃঙ্খলার চিত্র দেখা যায়নি। গাড়ি চলাচল নিয়মিত ছিল এবং যাত্রীরা নিয়ম মেনে পারাপার করেছেন।
তবে সম্ভাব্য অনিয়মিত অভিবাসন বা নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় তুরস্ক সরকার সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে বৈঠক করেছে। সেখানে সীমান্ত নজরদারি জোরদার এবং সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

আঞ্চলিক উত্তেজনার পটভূমি
এই সীমান্ত পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর দেশটিতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এরপর তেহরানে নতুন করে হামলা চালানো হয়। বিশ্লেষকদের মতে, পাঁচ দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে পড়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।
এই উত্তেজনার প্রভাবেই অনেক ইরানি নাগরিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে সীমান্ত এলাকায় চাপ তৈরি হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে খয় সীমান্ত গেটে ঠিক কী কারণে ইরানি নাগরিকদের আটকে রাখা হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে আঞ্চলিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে সীমান্ত পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















