মহাকাশে পৌঁছানো যতটা চ্যালেঞ্জের, তার চেয়েও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হলো পৃথিবীতে নিরাপদে ফিরে আসা। উৎক্ষেপণের সময় রকেটকে মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে লড়াই করে কক্ষপথের গতি অর্জন করতে হয়। আর ফেরার সময় সেই বিপুল গতিশক্তিকে নিয়ন্ত্রিতভাবে কমিয়ে আনতে হয় বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে সংঘর্ষের মাধ্যমে। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় পুনঃপ্রবেশ, যা আসলে আগুনের দেয়াল ভেদ করে বেঁচে ফেরার এক বৈজ্ঞানিক কৌশল।
আগুনে গলে না যাওয়ার বিজ্ঞান
প্রথমদিকে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, কক্ষপথে ঘুরতে থাকা কোনো ক্যাপসুল বায়ুমণ্ডলে ঢুকলেই প্রচণ্ড তাপে গলে যাবে। কারণ, পুনঃপ্রবেশের সময় সৃষ্ট তাপমাত্রা এত বেশি হয় যে তা সাধারণ ধাতু গলিয়ে দিতে পারে। পরে আবিষ্কৃত হয় ভোঁতা সামনের অংশের নকশা। গোলাকার ও প্রশস্ত সামনের দিক বায়ুর প্রবাহকে এমনভাবে সরিয়ে দেয় যে তাপের বড় অংশ ক্যাপসুলে না লেগে চারপাশের বায়ুতেই ছড়িয়ে পড়ে।

পুনঃপ্রবেশের সময় সৃষ্ট শক্তির ৯৮ শতাংশের বেশি বায়ুমণ্ডলেই তাপে রূপান্তরিত হয়ে নিঃশেষ হয়। ক্যাপসুলকে রক্ষা করে বিশেষ তাপঢাল। কোথাও পদার্থ ধীরে ধীরে পুড়ে তাপ সরিয়ে নেয়, কোথাও নিম্ন পরিবাহিতা উপাদান ভেতরের কাঠামোকে সুরক্ষিত রাখে।
পুনঃপ্রবেশ করিডর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
পৃথিবীতে ফিরতে হলে ক্যাপসুলকে প্রথমে কক্ষপথ ভাঙতে হয়। এজন্য ইঞ্জিন উল্টো দিকে জ্বালিয়ে গতি কমানো হয়। গতি কমলে মাধ্যাকর্ষণ প্রাধান্য পায় এবং ক্যাপসুল ধীরে ধীরে উপরের বায়ুমণ্ডলে ঢুকে পড়ে।
কিন্তু এই প্রবেশের কোণ অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নির্ধারিত। কোণ যদি খুব কম হয়, তাহলে ক্যাপসুল বায়ুমণ্ডলে ধাক্কা খেয়ে আবার মহাকাশে ফিরে যেতে পারে। আবার কোণ বেশি হলে ঘন বায়ুর সঙ্গে প্রবল সংঘর্ষে অতিরিক্ত চাপ ও তাপ সৃষ্টি হয়ে প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এই সূক্ষ্ম সীমার মধ্যবর্তী পথই পুনঃপ্রবেশ করিডর।

সেমি ব্যালিস্টিক কৌশল কী
একটি সাধারণ ব্যালিস্টিক বস্তু কেবল বাতাসের বাধায় ধীর হয়, নিজে দিক নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। কিন্তু সেমি ব্যালিস্টিক দেহ বিশেষ কোণে প্রবেশ করে, যাতে বায়ুর প্রবাহ অসমভাবে আঘাত করে উত্তোলন বল তৈরি হয়। এই বল ব্যবহার করে ক্যাপসুল কিছুটা ভেসে চলতে পারে এবং নির্দিষ্ট অবতরণ অঞ্চলের দিকে নিজেকে পরিচালিত করতে সক্ষম হয়।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার রহস্য
পুনঃপ্রবেশের সময় তীব্র তাপে বায়ু আয়নিত হয়ে প্লাজমার স্তর তৈরি করে। এই স্তর রেডিও সংকেত আটকে দেয়। ফলে কিছু সময়ের জন্য নভোচারী ও ভূমি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ থাকে। সংকেতকে উপগ্রহের মাধ্যমে উপরের পাতলা স্তর দিয়ে পাঠিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা হয়। এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারে এগিয়ে রয়েছে NASA।
অবতরণে প্যারাশুটের ভূমিকা

বায়ুমণ্ডলে ঢোকার পর বায়ুর বাধায় গতি কমলেও নিচের স্তরে ক্যাপসুলের গতি ঘণ্টায় কয়েকশ কিলোমিটার থাকতে পারে। নিরাপদ অবতরণের জন্য তাই নির্দিষ্ট উচ্চতায় প্যারাশুট খুলে দেওয়া হয়। এতে গতি আরও কমে সমুদ্রে নরম অবতরণ সম্ভব হয়।
গগনযানের প্রত্যাবর্তন পরিকল্পনা
ভারতের ISRO ইতিমধ্যে পুনঃপ্রবেশ প্রযুক্তিতে সফল পরীক্ষা চালিয়েছে। ২০০৭ সালের ক্যাপসুল পুনরুদ্ধার পরীক্ষা এবং ২০১৪ সালের বায়ুমণ্ডলীয় পুনঃপ্রবেশ পরীক্ষার মাধ্যমে তাপঢাল ও প্যারাশুট ব্যবস্থা যাচাই করা হয়।
Gaganyaan মিশনের কক্ষপথ মডিউলে রয়েছে ক্রু মডিউল ও সার্ভিস মডিউল। পৃথিবীতে ফেরার সময় প্রথমে গতি কমানো হবে, এরপর সার্ভিস অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পুড়ে যাবে। ক্রু মডিউল পুনঃপ্রবেশ করিডর ধরে সেমি ব্যালিস্টিক কৌশলে নিজেকে নির্ধারিত অবতরণ অঞ্চলের দিকে পরিচালিত করবে। শেষ ধাপে তিন স্তরের প্যারাশুট খুলে বঙ্গোপসাগরে নিরাপদ অবতরণ নিশ্চিত করা হবে।
মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে ফেরা তাই কেবল পতন নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত বিজ্ঞান, সূক্ষ্ম গণনা ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















