ফেব্রুয়ারির এক কনকনে সকালে ভার্জিনিয়ার রিচমন্ড শহরের একটি গির্জায় জড়ো হন প্রায় দুই শতাধিক মানুষ। কেউ ভোরের অন্ধকার কাটিয়ে গ্রামাঞ্চল থেকে এসেছেন, কেউ আবার রাজধানীর উপকণ্ঠ থেকে। তাদের রাজনৈতিক পরিচয় আলাদা হলেও লক্ষ্য এক—অসংযত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের বিস্তার ঠেকানো এবং জনজীবন রক্ষায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ।
রাজনীতির ভিন্ন মেরু, এক দাবিতে ঐক্য
রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—দুই শিবিরের সাধারণ মানুষ এক কণ্ঠে বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খুব দ্রুত এগোচ্ছে, কিন্তু সেই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোয়নি আইন, নীতিমালা কিংবা পরিবেশ সুরক্ষা। সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে অঙ্গরাজ্যের সিনেটর ডানিকা রোম প্রশ্ন ছুড়ে দেন—দুই দলই কি আপনাদের উপেক্ষা করছে না? করপোরেট লোভে কি পরিবেশ ও জীবনমান ধ্বংস হচ্ছে না? তার বক্তব্যে উপস্থিত জনতার করতালি ছিল তীব্র ও দীর্ঘ।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় তথ্যকেন্দ্র ঘিরে ক্ষোভ
ভার্জিনিয়া অঞ্চলে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম তথ্যকেন্দ্রগুলোর ঘনত্ব। এখানেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালনার জন্য বিপুল বিদ্যুৎ, পানি ও অবকাঠামো ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব তথ্যকেন্দ্রের কারণে বিদ্যুতের চাপ বাড়ছে, পানির ব্যবহার অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, শব্দদূষণও বাড়ছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, পরিবেশগত ক্ষতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তাদের জীবনযাত্রা বদলে দেবে।
সমাবেশ শেষে বিক্ষোভকারীরা অঙ্গরাজ্যের আইনসভা ভবনের দিকে পদযাত্রা করেন। সেখানে আইনপ্রণেতাদের সামনে তারা নিজেদের উদ্বেগ তুলে ধরেন। কয়েকজন আইনপ্রণেতা তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। এক প্রতিনিধি সরাসরি বলেন, সাধারণ মানুষ এখানে অন্যায্য চুক্তির শিকার হচ্ছেন।

জনমনে বাড়ছে সংশয়
যুক্তরাষ্ট্রে আজ খুব কম ইস্যুতেই জাতীয় ঐকমত্য দেখা যায়। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে উদ্বেগ যেন দলমত নির্বিশেষে ছড়িয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ায় যত মানুষ উচ্ছ্বসিত, তার চেয়ে বহু গুণ বেশি মানুষ উদ্বিগ্ন। অনেকেই মনে করছেন, এই প্রযুক্তি মানুষের সৃজনশীলতা কমিয়ে দেবে, সম্পর্কের গভীরতা ক্ষুণ্ন করবে এবং জটিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে দুর্বল করবে।
আরও কিছু জরিপ বলছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভুল তথ্য ছড়িয়ে দিতে পারে, মানুষের জীবনের উদ্দেশ্যবোধে আঘাত হানতে পারে এবং সামাজিক ও আবেগিক বুদ্ধিমত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ফলে প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করলেও, তার ভবিষ্যৎ প্রভাব নিয়ে শঙ্কা কাটছে না।

তৃণমূলের লড়াই থেকে জাতীয় বিতর্ক
এই আন্দোলন কেবল একটি অঙ্গরাজ্যের সীমায় আটকে নেই। গ্রামাঞ্চলের কৃষক থেকে শহুরে কর্মজীবী, ধর্মযাজক থেকে চলচ্চিত্র নির্মাতা—বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ একত্র হচ্ছেন। তাদের দাবি, প্রযুক্তি উন্নয়ন হোক, কিন্তু মানুষের জীবন, পরিবেশ ও গণতান্ত্রিক স্বার্থের ক্ষতি করে নয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই তৃণমূল আন্দোলন আগামী দিনে জাতীয় নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্প যত দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে, তত দ্রুত বাড়ছে নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির দাবি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















