দশকের পর দশক ধরে বিশ্বসেরা বিজ্ঞানীদের প্রধান গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা অনুদান কাটছাঁট, ভিসা জটিলতা ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। তরুণ গবেষকদের একাংশ এখন ইউরোপমুখী। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান অঙ্গনে নতুন করে শুরু হয়েছে ব্রেন ড্রেন নিয়ে আলোচনা।

গবেষণা তহবিল সংকোচনেই অস্থিরতা
ফরাসি জীববিজ্ঞানী গ্যাব্রিয়েলা লোবিনস্কা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলে যোগ দেন। সুস্থ কোষ কীভাবে সময়ের সঙ্গে অসুস্থ কোষে রূপান্তরিত হয়, সেই গবেষণাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। কিন্তু নির্বাচনের পর প্রশাসনের নীতিগত পরিবর্তনে গবেষণা অনুদান কেটে যায়। জাতীয় স্বাস্থ্য গবেষণা সংস্থার বাজেট ৪০ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব আসে। আন্তর্জাতিক গবেষকদের ভিসা দেওয়ার ক্ষমতাও সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যে লোবিনস্কা ভিয়েনায় নবগঠিত জৈবচিকিৎসা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজের প্রস্তাব পান। পরে তিনি বিশেষ একটি ফেলোশিপ পান, যা যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে আসা গবেষকদের চার বছরের তহবিল নিশ্চিত করে। বর্তমানে তিনি অস্ট্রিয়ায় গবেষণা করছেন।

ইউরোপের কৌশলী উদ্যোগ
অস্ট্রিয়ার বিজ্ঞান একাডেমির নেতৃত্ব বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে অস্থিরতা বিজ্ঞানচর্চার জন্য দুঃখজনক হলেও ইউরোপের জন্য এটি সুযোগ। ২০২৫ সালের মধ্যে কয়েক ডজন গবেষক এই বিশেষ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছেন।
একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক গবেষক আকর্ষণে বিশাল তহবিল ঘোষণা করেছে। জার্মানি ও ফ্রান্সও নতুন কর্মসূচি চালু করেছে, যার লক্ষ্য আমেরিকায় অনিশ্চয়তায় পড়া বিজ্ঞানীদের স্বাগত জানানো।
পরিসংখ্যান বলছে কী
এক শীর্ষ বৈজ্ঞানিক সাময়িকীর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে বিদেশে চাকরির জন্য যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিজ্ঞানীদের আবেদন ৩২ শতাংশ বেড়েছে। মার্চ মাসে বিদেশি চাকরির বিজ্ঞাপন দেখার হার আগের বছরের তুলনায় ৬৮ শতাংশ বেশি ছিল।
প্রায় আট হাজার গবেষণা অনুদান বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। কয়েক হাজার ফেডারেল গবেষক চাকরি হারিয়েছেন। ফলে তরুণ বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধায় পড়েছেন।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
একসময় জার্মানি ছিল বিশ্ববিজ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। নাৎসি শাসন শুরু হলে বহু ইউরোপীয় গবেষক যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক প্রতিভার নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠে। সরকারি গবেষণা ল্যাব, মুক্ত একাডেমিক পরিবেশ ও নাগরিকত্বের সুযোগ বিদেশি বিজ্ঞানীদের আকৃষ্ট করেছিল।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি পাল্টাচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, বৈশ্বিক প্রতিভা ছড়িয়ে পড়লে তার প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, পুরো বিশ্বের ওপর পড়বে। কারণ মৌলিক গবেষণাই প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ভিত্তি।
ইউরোপ কি পারবে প্রতিযোগিতায়
মোট গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয়ে এখনও যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে। তবে ইউরোপ নতুন অবকাঠামো ও স্বাধীন গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে তুলে আকর্ষণ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ভিয়েনার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটে নতুন ল্যাব গড়ে উঠছে দ্রুত।
তবুও অনিশ্চয়তা কেবল আমেরিকায় নয়, ইউরোপেও আছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা ভবিষ্যতের বিজ্ঞান বাজেটে প্রভাব ফেলতে পারে।

ভবিষ্যৎ কোন পথে
হার্ভার্ডে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও নীতিগত টানাপোড়েন এখনো কাটেনি। অনেক বিজ্ঞানী বলছেন, গবেষণা থেমে থাকে না। যেখানে কাজের পরিবেশ ও তহবিল নিশ্চিত, সেখানেই তাঁরা যাবেন।
বিশ্ববিজ্ঞানের কেন্দ্র কি আবার সরে যাচ্ছে? নাকি এটি সাময়িক অস্থিরতা? আপাতত নিশ্চিত একটাই—বৈশ্বিক বিজ্ঞান মানচিত্রে নতুন এক পুনর্বিন্যাস শুরু হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















