মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালী ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি তীব্র হয়েছে। এর ফলে তেল পরিবহন ভাড়া ও জাহাজ বিমার খরচ হঠাৎ বেড়ে গেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান এই সমুদ্রপথে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন সংকটের কেন্দ্রে।
তেল পরিবহনে অস্বাভাবিক ভাড়া বৃদ্ধি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানের পাল্টা পদক্ষেপের আশঙ্কায় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল পরিবহনে জাহাজমালিকরা অনেক বেশি ভাড়া দাবি করছেন। জাহাজবাজার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনে অতিবৃহৎ তেলবাহী জাহাজে তেল নিতে প্রায় ৭০০ ওয়ার্ল্ডস্কেল পয়েন্ট পর্যন্ত ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। এতে পূর্ব চীনে প্রতি ব্যারেল তেল পৌঁছাতে খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২০ ডলার, যেখানে গত বছর গড় ব্যয় ছিল মাত্র আড়াই ডলার।
একটি গ্রিক নিয়ন্ত্রিত ট্যাংকার ৫২৫ ওয়ার্ল্ডস্কেলে প্রাথমিকভাবে ভাড়া হয়েছে, যা দৈনিক প্রায় সাড়ে তিন লাখ ডলার আয়ের সমান। বাজার নির্ধারণকারী সংস্থাগুলোও হরমুজ পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন করে মানদণ্ড নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী
হরমুজ প্রণালী ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত। প্রায় ১০০ মাইল দীর্ঘ এবং সবচেয়ে সরু স্থানে মাত্র ২১ মাইল প্রশস্ত এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২ কোটির বেশি ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়। বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথেই যায়। ফলে এখানে সামান্য বিঘ্নও বিশ্ববাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর চাপ
ওপেকের অন্যতম বড় উৎপাদক আমিরাত তার অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল রপ্তানির জন্য হরমুজের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি পরিশোধিত জ্বালানি ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনেও এই পথ গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক হামলার পর অন্তত ১৫০টি তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ প্রণালীর বাইরে নোঙর করেছে। আরও বহু জাহাজ চলাচল বন্ধ রেখে অপেক্ষায় রয়েছে। উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক জলসীমায় এসব জাহাজের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
মার্কিন নৌবাহিনী নেতৃত্বাধীন সামুদ্রিক তথ্যকেন্দ্র জানিয়েছে, আনুষ্ঠানিকভাবে চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়নি। তবে নৌ উপস্থিতি বৃদ্ধি, কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, রেডিও যোগাযোগের মাধ্যমে সতর্কতা এবং নোঙর এলাকায় ভিড় বাড়ার সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে।

বিমা ব্যয়ে ধাক্কা
ঝুঁকি বাড়ায় যুদ্ধঝুঁকি বিমাকারীরা নতুন শর্ত আরোপ ও কিছু ক্ষেত্রে বাতিল নোটিশ পাঠিয়েছে। প্রিমিয়াম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আগে উপসাগর দিয়ে চলাচলে একটি জাহাজের বিমা ব্যয় ছিল জাহাজের মোট মূল্যের প্রায় শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ। ১০০ মিলিয়ন ডলারের জাহাজের ক্ষেত্রে তা ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার থেকে বেড়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে।
বিমা বিশেষজ্ঞদের মতে, হামলা অব্যাহত থাকলে ইরান আঞ্চলিক নৌপথকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এমনকি জাহাজ আটকানোর ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
বন্দর ও বাণিজ্যের ঝুঁকি
আমিরাতের হাবশান-ফুজাইরাহ পাইপলাইন প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল তেল প্রণালী এড়িয়ে ওমান উপসাগরের ফুজাইরাহ বন্দরে পৌঁছে দিতে পারে। তবে ইরাক, কুয়েত ও কাতারের অধিকাংশ রপ্তানি এখনো হরমুজ দিয়েই যেতে হয়।
এ ছাড়া জেবেল আলি ও খোর ফাক্কান বন্দর এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যে পণ্য পরিবহনের বড় কেন্দ্র। এই পথ ব্যাহত হলে কনটেইনার বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশ্বের বড় শিপিং কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যে সতর্ক পদক্ষেপ নিয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল স্থগিত করেছে, কেউ কেউ জাহাজকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে, আবার কেউ আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে বিকল্প পথ ব্যবহার করছে। এর ফলে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে।
কনটেইনার পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি
মধ্যপ্রাচ্যগামী কনটেইনার পরিবহনে ভাড়া বাড়বে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। সমুদ্রপথের বিকল্প কার্যত নেই বলেই ব্যয়বৃদ্ধি দীর্ঘায়িত হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি যে হারে বেড়েছে, তাতে পরিবহন শিল্পকে প্রায় নিয়মিত বিকল্প পরিকল্পনা করতে হচ্ছে।
বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েক দিনের জন্যও হরমুজ পুরোপুরি বন্ধ হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে যেতে পারে। চলতি বছরের শুরুতে গড় মূল্য ছিল প্রায় ৬৭ ডলার, যদিও সাম্প্রতিক উত্তেজনায় তা সাময়িকভাবে ৮০ ডলার ছাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, পুরো প্রণালী বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে বিচ্ছিন্ন হামলা বা নিরাপত্তা ঝুঁকিই জাহাজমালিকদের নিরুৎসাহিত করতে যথেষ্ট। এতে বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে।
বৈশ্বিক প্রভাবের আশঙ্কা
উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্ব অ্যালুমিনিয়াম রপ্তানির প্রায় ১৫ শতাংশ এবং সার বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ করে। দুবাইভিত্তিক একটি বড় চিনি শোধনাগার বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ৩ শতাংশ পরিচালনা করে, যার অংশবিশেষ রপ্তানিও হরমুজ দিয়ে যায়।
অতএব, দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি মূল্য, পরিবহন ব্যয় ও বিমা খরচ বাড়িয়ে নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করতে পারে। আর এই পুরো পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আমিরাতের বন্দর, পাইপলাইন ও বাণিজ্যপথ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















