ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়ে মার্কিন জনগণের উদ্দেশে সরাসরি বক্তব্য দিতে ট্রাম্প প্রশাসন ৪৮ ঘণ্টারও বেশি সময় নিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই যোগাযোগ কৌশলকে অনেকেই তার অপ্রচলিত রাজনৈতিক শৈলীর অংশ হিসেবে দেখছেন। তবে এতে প্রশ্ন ও সমালোচনা দুটোই জোরালো হয়েছে, বিশেষ করে যখন যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর প্রথম হতাহতের ঘটনা ঘটে।
সরাসরি ভাষণের বদলে বিকল্প পন্থা
যুদ্ধ শুরুর পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে সামরিক বীরদের সম্মাননা অনুষ্ঠানে হামলার কারণ ব্যাখ্যা করেন, কিন্তু সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন নেননি। এর আগে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন পেন্টাগনে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।
তবে যুদ্ধের প্রথম দুই দিনে ট্রাম্প জাতির উদ্দেশে সরাসরি ভাষণ দেননি। বরং তিনি নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দুটি পূর্বধারিত ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি একাধিক সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। এসব কথোপকথনের অনেকগুলোই ছিল সংক্ষিপ্ত এবং খণ্ডিত, যা পরিস্থিতি স্পষ্ট করার চেয়ে অনেকের কাছে আরও ধোঁয়াশা তৈরি করেছে।
সমালোচনার মুখে প্রেসিডেন্ট
সমালোচকরা বলছেন, যুদ্ধের লক্ষ্য ও কৌশল নিয়ে ট্রাম্প পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা দেননি। সাবেক হোয়াইট হাউস চিফ অব স্টাফ রহম ইমানুয়েল মন্তব্য করেন, “আমেরিকান জনগণের একজন কমান্ডার ইন চিফ দরকার, কিন্তু সেই ভূমিকায় তাকে অনুপস্থিত মনে হয়েছে।”
অন্যদিকে নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রধান হোয়াইট হাউস সংবাদদাতা পিটার বেকার সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, অতীতের প্রেসিডেন্টদের মতো ট্রাম্প ওভাল অফিস থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেননি; বরং তিনি মার-আ-লাগোতে রাজনৈতিক তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানে ছিলেন।
এই মন্তব্যের জবাবে হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চিয়াং বলেন, প্রেসিডেন্ট নিরাপদ স্থানে থেকে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন, বিশ্বনেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন এবং একাধিক বক্তব্য দিয়েছেন, যা কোটি কোটি মানুষ দেখেছেন। তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প অসংখ্য সাংবাদিকের ফোনকলও গ্রহণ করেছেন।
টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বিভ্রান্তি
ট্রাম্প এবিসি, সিবিএস, এনবিসি, সিএনএন, সিএনবিসি, ফক্স নিউজ, দ্য আটলান্টিক, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, অ্যাক্সিওস, পলিটিকো এবং একটি ইসরায়েলি টেলিভিশন চ্যানেলসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
তবে অধিকাংশ কথোপকথন ছিল সংক্ষিপ্ত। কিছু ক্ষেত্রে তার বক্তব্য পরস্পরবিরোধী বলেও সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়। নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, ছয় মিনিটের এক আলোচনায় ট্রাম্প ইরানের ক্ষমতার কাঠামো বদলাবে কি না, কিংবা বর্তমান কাঠামো বহাল থাকবে কি না—এ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ইঙ্গিত দেন।
এবিসি নিউজের সাংবাদিক জনাথন কার্ল জানান, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর বিষয়ে প্রশ্ন করলে ট্রাম্প বলেন, “ওরা দু’বার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আমি আগে আঘাত করেছি।” সিএনএনের জেক ট্যাপারকে তিনি ইঙ্গিত দেন, “সবচেয়ে বড় হামলাটি সামনে আসছে।”
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, “মার্কিন ইতিহাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতো স্বচ্ছ ও সহজলভ্য প্রেসিডেন্ট আর কেউ ছিলেন না।”
পেন্টাগন ব্রিফিংয়ে প্রশ্নবাছাই
রবিবার রাতেই সাংবাদিকরা জানতে পারেন যে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ ব্রিফিং করবেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, রয়টার্স, এবিসি, সিবিএস, এনবিসি, সিএনএন, ফক্স নিউজ ও স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপসের সাংবাদিকরা ব্রিফিং কক্ষে উপস্থিত ছিলেন। তবে হেগসেথ মূলধারার এসব সংবাদমাধ্যমের প্রশ্ন না নিয়ে নিউজ নেশন ও ট্রাম্পপন্থী কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রশ্ন গ্রহণ করেন।
হেগসেথ বলেন, অভিযানের আগাম বিস্তারিত জানতে চাওয়া “অযৌক্তিক” এবং প্রয়োজন হলে কেবল আকাশপথে নয়, আরও পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। তিনি জানান, লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে।
এনবিসি নিউজের এক সাংবাদিক যখন জানতে চান, প্রেসিডেন্ট চার সপ্তাহের সময়সীমা দিয়েছেন—তাহলে কি তার বক্তব্য ভুল?—তখন প্রথমে হেগসেথ প্রশ্নটি এড়িয়ে যান। পরে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট সময়সীমা নিয়ে মন্তব্য করার পূর্ণ স্বাধীনতা রাখেন এবং সামরিক বাহিনী তার নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবে।
অতীতের প্রশাসনের তুলনায় এবার পেন্টাগন ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের জন্য নির্দিষ্ট আসন বরাদ্দ ছিল, যেখানে ট্রাম্প-সমর্থক গণমাধ্যমগুলোকে সামনের সারিতে বসানো হয়।
যোগাযোগ কৌশলের প্রভাব
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুদ্ধের প্রথম দিনেই দুটি বক্তব্য দেন এবং হামলাস্থলে সাংবাদিকদের সামনে উপস্থিত হন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীও প্রতিদিন একাধিক ব্রিফিং করেছে।
তার বিপরীতে, ট্রাম্প প্রশাসনের যোগাযোগ কৌশল ছিল ছড়ানো-ছিটানো ও অনিয়মিত। এতে একদিকে প্রেসিডেন্টের সরাসরি গণমাধ্যমে অংশগ্রহণের দাবি জোরালো হলেও, অন্যদিকে স্পষ্ট ও কেন্দ্রীভূত বার্তার অভাব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে, আধুনিক যুদ্ধে সামরিক কৌশলের পাশাপাশি জনসংযোগ কৌশলও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মূল্যায়নে বড় ভূমিকা রাখে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















