ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়ে বাড়তে থাকা সমালোচনার জবাব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল। তবে কেন এখনই যুদ্ধ শুরু করা হলো এবং এর শেষ লক্ষ্য কী—এ বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা না দেওয়ায় রাজনৈতিক মহলসহ তার নিজের সমর্থক গোষ্ঠীর মধ্যেও প্রশ্ন উঠছে।
সংঘাত বাড়ছে, বাড়ছে উদ্বেগ
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। ইরান একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল, অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের ওপর। একই সঙ্গে লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলায় নতুন ফ্রন্ট খুলেছে।
এদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে, মধ্যপ্রাচ্যে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে, আর ওয়াশিংটন ইঙ্গিত দিচ্ছে—এ যুদ্ধ সম্ভবত কেবল শুরু মাত্র। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে।

স্থলসেনা পাঠানোর সম্ভাবনা?
ট্রাম্প নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্থলসেনা পাঠানোর সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি। তিনি বলেন, “অনেক প্রেসিডেন্ট বলেন—স্থলসেনা পাঠানো হবে না। আমি সে কথা বলি না। আমি বলি, সম্ভবত লাগবে না, কিন্তু প্রয়োজন হলে বিবেচনা করা হবে।”
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। তিনি জানান, প্রশাসন আগাম ঘোষণা দিয়ে নিজেদের কৌশল প্রকাশ করতে চায় না। কতদিন অভিযান চলবে—চার সপ্তাহ, ছয় সপ্তাহ না তারও বেশি—সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা দেননি তিনি।
হোয়াইট হাউসে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান নির্ধারিত সময়ের আগেই এগোচ্ছে। তার মতে, চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব, তবে প্রয়োজনে আরও দীর্ঘ সময় অভিযান চালানোর সক্ষমতা রয়েছে।
মাগা শিবিরেই অস্বস্তি
ট্রাম্প “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির ভিত্তিতে ক্ষমতায় ফিরেছিলেন। অতীতেও তিনি ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বিদেশে শাসন পরিবর্তন ও রাষ্ট্রগঠন নীতির বিরোধিতা ছিল তার প্রচারণার মূল স্লোগানগুলোর একটি।

কিন্তু এখন তার এই সিদ্ধান্তে নিজস্ব রাজনৈতিক ঘাঁটি “মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন” বা মাগা শিবিরের মধ্যেই অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের মিত্র এরিক প্রিন্স প্রকাশ্যে হতাশা জানিয়ে বলেন, এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে নয় এবং এটি বিশৃঙ্খলা বাড়াতে পারে।
ইউটিউব উপস্থাপক বেনি জনসন, প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব অ্যান্ড্রু টেট এবং রক্ষণশীল ভাষ্যকার টাকার কার্লসনের মতো কয়েকজন প্রভাবশালী সমর্থকও ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তবে ট্রাম্প এসব সমালোচনাকে গুরুত্ব দেননি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “মাগা চায় আমাদের দেশ নিরাপদ ও সমৃদ্ধ হোক। তারা আমার সব পদক্ষেপকেই সমর্থন করে।” তার ভাষায়, ইরান প্রসঙ্গটি নিরাপত্তার স্বার্থে নেওয়া একটি ‘প্রয়োজনীয় পথবিচ্যুতি’।
অন্যদিকে কংগ্রেসম্যান টিম বারচেট বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাজ করেছে, আমেরিকানদের হত্যা করেছে এবং হিজবুল্লাহসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীকে অস্ত্র সরবরাহ করেছে। তাই এ পদক্ষেপ সমর্থনযোগ্য।
ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা
মার্কিন যৌথ বাহিনীর চেয়ারম্যান ড্যান কেইন জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে আরও হতাহতের আশঙ্কা রয়েছে। সোমবার পর্যন্ত ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত এবং আরও কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে তিনি জানান।
শাসন পরিবর্তন না ভেঙে পড়া?
সংঘাতের শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং শীর্ষ নেতৃত্বের কয়েকজন নিহত হন। কিন্তু এরপর ইরানের ক্ষমতা কার হাতে যাবে—সে বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা জানায়নি।

ট্রাম্প ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডকে অস্ত্র নামিয়ে রাখতে আহ্বান জানালেও ইতিহাস বলছে, কেবল বিমান হামলা দিয়ে শাসন পরিবর্তন আনা কঠিন। বোমাবর্ষণ শেষ হলে ইরানের বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও তিনি দেননি।
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী সহসভাপতি ত্রিতা পারসি মনে করেন, ট্রাম্প হয়তো সরাসরি শাসন পরিবর্তনের বদলে ‘শাসন ভেঙে পড়া’ পরিস্থিতি মেনে নিতে পারেন। এতে প্রশাসন ভবিষ্যৎ বিশৃঙ্খলার দায় এড়াতে পারবে।
অন্যদিকে ইসরায়েল চায় আরও দীর্ঘমেয়াদি ও সিদ্ধান্তমূলক অভিযান, যাতে ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বকে চূড়ান্তভাবে দুর্বল করা যায়। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল শ্যাপিরোর মতে, ইসরায়েলের আশঙ্কা—ট্রাম্প হয়তো দ্রুত বিজয় ঘোষণা করে অভিযান থামিয়ে দিতে পারেন।
গোয়েন্দা তথ্য ও পারমাণবিক প্রশ্ন
রবিবার কংগ্রেসে দেওয়া এক গোপন ব্রিফিংয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, ইরান তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল—এমন নির্দিষ্ট তথ্য তাদের কাছে ছিল না। বরং অঞ্চলজুড়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও মিত্র বাহিনীগুলোর কারণে একটি সামগ্রিক হুমকি ছিল।

তবে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছিল, যা যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে সক্ষম। যদিও ইরান আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কথা স্বীকার করেনি। মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা গত বছর জানায়, তেহরান চাইলে ২০৩৫ সালের মধ্যে এমন সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
এছাড়া ট্রাম্প আবারও দাবি করেন, গত জুনে ১২ দিনের ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস হলেও দেশটি পুনরায় পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তুলতে চাইছিল।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রোসি বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলেও বর্তমানে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো সক্রিয় কর্মসূচি নেই। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের ঢুকতে দিচ্ছে না তেহরান।
আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের নীতিনির্ধারণ পরিচালক কেলসি ড্যাভেনপোর্টের মতে, শাসন পরিবর্তন কোনো কার্যকর পারমাণবিক বিস্তার রোধ কৌশল নয়। তার ভাষায়, “ইরানের পারমাণবিক জ্ঞান বোমা মেরে মুছে ফেলা যাবে না। শাসন পরিবর্তন হলেও ঝুঁকি থেকেই যাবে।”
সমালোচনা, অনিশ্চয়তা ও কৌশলগত দ্বিধার মধ্যেই ইরানকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধনীতি এখন মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রীয় ইস্যু হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















