গত চার বছরে ইউক্রেনের আকাশে ইরানি নকশার ড্রোনের যে স্বতন্ত্র গুঞ্জন শোনা গেছে, এখন সেই শব্দ ক্রমেই শোনা যাচ্ছে পারস্য উপসাগরজুড়ে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার জবাবে ইরান কম খরচে কিন্তু কার্যকর এই অস্ত্র ব্যবহার করে পাল্টা আঘাত হানছে।
শাহেদ ড্রোন আধুনিক যুদ্ধে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ইউক্রেনে রাশিয়া রাতের পর রাত ঝাঁকে ঝাঁকে এসব ড্রোন পাঠিয়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছে।
কম খরচে বড় আঘাত
ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুতগতির এবং বেশি শক্তিশালী হলেও এগুলোর দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার এবং মজুত সীমিত। বিপরীতে একটি শাহেদ ড্রোনের দাম কয়েক দশ হাজার ডলার—একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় অতি সামান্য।
সংখ্যায় বেশি থাকায় এই ড্রোনগুলো একসঙ্গে আক্রমণ চালিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে পারে এবং কম খরচে বড় ক্ষতি করতে সক্ষম হয়।

ইউক্রেনে প্রথম ব্যবহার
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের শুরুতে ট্যাংক, সেনা ও ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে কিয়েভ দখলের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর যুদ্ধ ধীরে ধীরে ক্ষয়যুদ্ধে রূপ নেয়। এই পর্যায়ে ড্রোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করে।
ছোট ড্রোনের পাশাপাশি রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়ই দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করে একে অপরের ভূখণ্ডের গভীরে হামলা চালায়। যুদ্ধের শুরুর দিকে তেহরানের সঙ্গে চুক্তি করে রাশিয়া শাহেদ ড্রোন আমদানি করে এবং পরে নিজস্ব উৎপাদন শুরু করে।
রুশ প্রকৌশলীরা ড্রোনের উচ্চতা বাড়িয়েছে, জ্যামিং প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত করেছে এবং আরও শক্তিশালী বিস্ফোরক সংযোজন করেছে। রাশিয়ায় এটি ‘জেরান’ নামে উৎপাদিত হচ্ছে এবং তাতারস্তানে একটি কারখানায় এর উৎপাদন বহুগুণ বেড়েছে।
এখন রাশিয়া এক রাতে শত শত ড্রোন ছুড়ে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলছে। বড় আকারের সমন্বিত হামলার মাধ্যমে তারা ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যস্ত রাখে এবং একই সঙ্গে দামী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।
শাহেদ ড্রোন ঘণ্টায় প্রায় ১৮০ কিলোমিটার গতিতে উড়ে, প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে এবং প্রায় ৪০ কেজি বিস্ফোরক বহন করতে সক্ষম। এর গুঞ্জনের জন্য ইউক্রেনীয়রা একে ‘মোপেড’ নাম দিয়েছে।

ইউক্রেনের প্রতিরোধ কৌশল
দামী পশ্চিমা ক্ষেপণাস্ত্র অপচয় এড়াতে ইউক্রেন মোবাইল মেশিনগান টিম ব্যবহার করে কম খরচে ড্রোন ভূপাতিত করার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি তারা প্রতিরোধী ড্রোন তৈরি করছে এবং উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তবে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান হামলায় তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা
সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান ইসরায়েলের পাশাপাশি সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, বন্দর, বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, তেলবাহী জাহাজ এবং কিছু উঁচু ভবন এসব হামলার লক্ষ্য ছিল।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুই দিনে তারা ১৬৫টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৫৪০টির বেশি ইরানি ড্রোন মোকাবিলা করেছে। বেশিরভাগ হামলা প্রতিহত করা হলেও ধ্বংসাবশেষ থেকে কিছু স্থানে আগুন লেগেছে।
কিছু ইরানি ড্রোন সাইপ্রাসে অবস্থিত যুক্তরাজ্যের সামরিক ঘাঁটির দিকেও উড়ে যায়। আকরোটিরি ঘাঁটির রানওয়েতে একটি ড্রোন আঘাত হানে এবং পরদিন আরও দুটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়।
উন্নত প্রতিরক্ষা বনাম সস্তা ড্রোন
ইসরায়েলের দিকে ছোড়া ইরানের বেশিরভাগ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে বিপুল সংখ্যক সস্তা ড্রোন তুলনামূলকভাবে কম সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পেরেছে।
বিশ্লেষকদের মত
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্রোন যুদ্ধের ধরন পাল্টে দিয়েছে। স্থায়ী নজরদারি, উচ্চ নির্ভুলতা, উন্নত লক্ষ্য নির্ধারণ প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয় ড্রোনকে অত্যন্ত কার্যকর করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শাহেদ ড্রোন সহজেই ট্রাকের পেছনে লুকিয়ে রাখা যায়, যা দ্রুত মোতায়েনকে সহজ করে। এবারের পাল্টা হামলায় ইরানের তীব্রতা ও ব্যাপকতা অনেককেই বিস্মিত করেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ইউক্রেনে রাশিয়ার ড্রোন হামলা মোকাবিলায় যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কাজে লাগাতে পারে।
ড্রোন এখন শুধু একটি অস্ত্র নয়, বরং আধুনিক যুদ্ধের কৌশলগত সমীকরণ বদলে দেওয়া এক বাস্তবতা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















