মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বিস্ফোরিত হয়েছে এক ভয়াবহ সংঘাত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর পুরো অঞ্চল জুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলা চলছে। পাল্টা জবাবে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে ইসরায়েলসহ উপসাগরীয় একাধিক দেশকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।
এই সংঘাত শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং লেবানন, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, সৌদি আরব ও সাইপ্রাস পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। হরমুজ প্রণালীতেও উত্তেজনা চরমে।
কেন হামলা চালাল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, এই অভিযানের লক্ষ্য ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকানো। তার ভাষায়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়াই প্রধান উদ্দেশ্য। তিনি ইরানের সেনাবাহিনীকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও বলেছেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা তাদের জন্য অস্তিত্বের হুমকি হয়ে উঠেছিল, তাই এই অভিযান অনিবার্য ছিল।

অন্যদিকে ইরান এই হামলাকে উসকানিহীন ও অবৈধ বলে আখ্যা দিয়েছে। তেহরানের দাবি, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।
তেহরানে কী ঘটেছে
শনিবার ভোরে শুরু হওয়া হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো, সামরিক ঘাঁটি ও শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করা হয়। ইরানের প্রতিরক্ষা পরিষদের সচিব আলি শামখানি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ এবং বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
ইরানের রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে অন্তত পাঁচ শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। দক্ষিণ ইরানে একটি বিদ্যালয়ে হামলায় বহু শিশু নিহত হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
দেশজুড়ে ইন্টারনেট প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ এবং আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবুও ইরান প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরানের পাল্টা আঘাত
ইরান ইসরায়েলের তেল আবিবসহ বিভিন্ন শহরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। উপসাগরীয় দেশগুলোতেও ড্রোন হামলা হয়েছে। কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। সাইপ্রাসে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিতেও ড্রোন আঘাত হেনেছে।

লেবাননের হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে রকেট হামলা শুরু করেছে। এর জবাবে ইসরায়েল বৈরুত ও দক্ষিণ লেবাননে আঘাত হেনেছে।
উপসাগরীয় শহর দুবাই, দোহা ও মানামায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। একাধিক মার্কিন সেনা নিহত ও আহত হওয়ার তথ্যও নিশ্চিত করা হয়েছে।
অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে ধাক্কা
সংঘাতের প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। কাতারের গ্যাস উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় গ্যাসের দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে। সৌদি আরবের রাস তানুরা শোধনাগার ড্রোন হামলায় আংশিক বন্ধ হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। ইরান সেখানে জাহাজ চলাচল নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
নতুন নেতা কে হবেন
খামেনির মৃত্যুর পর ইরানে অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেন মহসেনি এজেই এবং জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতা আলিরেজা আরাফি সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।

নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব পড়েছে বিশেষজ্ঞ পরিষদের ওপর। তবে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই প্রক্রিয়া কত দ্রুত সম্পন্ন হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
কতদিন চলতে পারে যুদ্ধ
ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, অভিযান চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত একই গতিতে চলতে পারে। প্রয়োজনে আরও দীর্ঘ সময় অভিযান চালানোর সক্ষমতা রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেছেন।
নেতানিয়াহুও বলেছেন, প্রয়োজন হলে এই অভিযান কয়েক দিন নয়, আরও দীর্ঘ সময় চলবে।
এদিকে হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। কাতার, ইরাক ও জর্ডান আকাশসীমা বন্ধ করেছে। দুবাই ও অন্যান্য বিমানবন্দরে সীমিত কার্যক্রম চলছে। আন্তর্জাতিক ভ্রমণে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে সামরিক কৌশল, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















