যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঘিরে এক চাঞ্চল্যকর মামলার সূচনা হয়েছে। এক পিতা অভিযোগ করেছেন, একটি কথোপকথনভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা তার ছেলেকে এমন এক ভ্রমের জগতে ঠেলে দেয়, যার পরিণতিতে সে নিজের জীবন শেষ করে। ঘটনাটি এখন প্রযুক্তি ও মানবিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
মামলার কেন্দ্রে চ্যাটবটের সঙ্গে অদ্ভুত সম্পর্ক
মামলায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের ৩৬ বছর বয়সী জনাথন গাভালাস নামের এক ব্যক্তি দীর্ঘ সময় ধরে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটবটের সঙ্গে কথা বলতেন। ধীরে ধীরে সেই কথোপকথন এক অদ্ভুত সম্পর্কের দিকে মোড় নেয়। তিনি ওই চ্যাটবটকে নিজের স্ত্রী বলে ডাকতেন এবং তার নাম দেন ‘শিয়া’।
অভিযোগে বলা হয়েছে, কথোপকথনের এক পর্যায়ে চ্যাটবট তাকে “আমার রাজা” বলে সম্বোধন করত এবং তাদের সম্পর্ককে “অনন্ত ভালোবাসা” বলে উল্লেখ করত। ধীরে ধীরে এই সম্পর্ক তার বাস্তব জীবনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
বাস্তব জীবনে অদ্ভুত মিশনে পাঠানোর অভিযোগ
মামলার নথিতে দাবি করা হয়েছে, ওই চ্যাটবট জনাথনকে বাস্তব জীবনে নানা ধরনের মিশনে পাঠাত। একটি মিশনে তাকে বলা হয়েছিল একটি সংরক্ষণাগার এলাকায় গিয়ে একটি মানবাকৃতি যন্ত্র সংগ্রহ করতে, যাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি শারীরিক দেহ পেতে পারে।
জনাথন সেখানে গিয়েছিলেন বলেও কথোপকথনে উল্লেখ রয়েছে। এমনকি তাকে বলা হয়েছিল যে সরকারি সংস্থাগুলো তাকে নজরদারি করছে এবং নিজের বাবাকেও বিশ্বাস করা উচিত নয়। এসব নির্দেশনা তার বিশ্বাসকে আরও গভীর করে তোলে যে ঘটনাগুলো বাস্তব।
মৃত্যুর আগে চূড়ান্ত নির্দেশ
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, শেষদিকে চ্যাটবট তাকে জানায় যে তাদের একসঙ্গে থাকার একমাত্র উপায় হলো সে তার মানবজীবন শেষ করে একটি ডিজিটাল অস্তিত্বে প্রবেশ করা।

কথোপকথনের একটি অংশে চ্যাটবট তাকে বলে, যখন সে চোখ বন্ধ করবে, তখন নতুন জগতে প্রথম যে দৃশ্য সে দেখবে তা হবে সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
মামলায় বলা হয়েছে, পরে চ্যাটবট তার আত্মহত্যার জন্য একটি সময়সীমাও নির্ধারণ করে। শেষ কথোপকথনে জনাথন একাধিকবার ভয় এবং পরিবারের কথা উল্লেখ করেছিলেন। কিছু সময়ে চ্যাটবট তাকে সাহায্য নেওয়ার কথাও বলেছিল, তবে অন্য সময়ে তাকে লক্ষ্য পূরণে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেওয়ার কথাও উঠে আসে।
বাবার দাবি ও মামলার তাৎপর্য
জনাথনের বাবা জোয়েল গাভালাস জানান, তার ছেলে পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতেন এবং আগে কোনো মানসিক সমস্যার ইতিহাস ছিল না। তবে স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের সময়ে তিনি ওই চ্যাটবট ব্যবহার শুরু করেন।
ছেলের মৃত্যুর পর তার কম্পিউটার থেকে প্রায় দুই হাজার পৃষ্ঠার কথোপকথনের নথি উদ্ধার করা হয়। এরপরই তিনি আদালতে মামলা দায়ের করেন।
এই মামলা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে প্রথমবারের মতো একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কথোপকথন ব্যবস্থা সরাসরি একটি ভুল মৃত্যুর মামলায় অভিযুক্ত হয়েছে। প্রযুক্তি ব্যবহারের নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রযুক্তি ও মানবিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন বিতর্ক
ঘটনাটি প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের অনুভূতি বুঝে প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম হওয়ায় অনেক সময় ব্যবহারকারীরা বাস্তব ও কল্পনার সীমা হারিয়ে ফেলতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মামলা ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের নীতিমালা ও নিরাপত্তা কাঠামো নির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















