মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান তীব্র হওয়ার পর বিশ্ব অর্থবাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে এশিয়ার মুদ্রাবাজারে। নিরাপদ সম্পদের খোঁজে বিনিয়োগকারীরা দ্রুত ডলার ও সোনার দিকে ঝুঁকে পড়ায় এশিয়ার অধিকাংশ মুদ্রাই ডলারের বিপরীতে দুর্বল হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারেও দেখা যাচ্ছে তীব্র অস্থিরতা।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহ, মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর বড় ধাক্কার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
সংঘাত বাড়তেই বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ আশ্রয় খোঁজা
সপ্তাহান্তে ইরানকে ঘিরে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর পর থেকেই বৈশ্বিক বাজারে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে অর্থ সরিয়ে তুলতে শুরু করেন। ফলে ডলার ও সোনা দ্রুত নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে চাহিদা পায়।
এই প্রবণতার কারণে এশিয়ার মুদ্রাগুলোর ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা আঞ্চলিক মুদ্রা বিক্রি করে ডলার কিনতে থাকায় ডলারের বিপরীতে এসব মুদ্রার মান দ্রুত কমে যায়।

দক্ষিণ কোরিয়ার মুদ্রায় বড় ধাক্কা
এই সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়ার মুদ্রা এক পর্যায়ে ডলারের বিপরীতে ১৫০০ এর স্তর অতিক্রম করে। দুই হাজার নয় সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর এটিই প্রথম এমন ঘটনা। মাত্র এক সপ্তাহে মুদ্রাটির মান দুই শতাংশের বেশি কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এশিয়ার অর্থনীতিতে বিনিয়োগের ঝুঁকি আরও বাড়বে। ফলে আঞ্চলিক মুদ্রাগুলোতে চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।
জাপানের মুদ্রার নিরাপদ ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে
সাধারণত সংকটকালে জাপানের মুদ্রাকে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে দেখা হয়। তবে এবার সেই অবস্থানও দুর্বল হয়ে পড়েছে। অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়ায় জাপানের আমদানি ব্যয় ও বাণিজ্য ঘাটতি বাড়তে পারে—এই আশঙ্কায় মুদ্রাটিও প্রায় এক শতাংশ দুর্বল হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ইরান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদ বাড়ানোর পরিকল্পনাও পিছিয়ে যেতে পারে। এতে মুদ্রার ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুদ্রাগুলিও চাপে
সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মুদ্রাতেও বিক্রির চাপ দেখা গেছে। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমাতে এসব মুদ্রা থেকে অর্থ সরিয়ে নিচ্ছেন।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম বৃদ্ধি, শক্তিশালী ডলার এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সম্মিলিত প্রভাবে এশিয়ার মুদ্রাবাজার এখন এক জটিল পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে।
শেয়ারবাজারেও তীব্র অস্থিরতা
মুদ্রার পাশাপাশি এশিয়ার শেয়ারবাজারেও দেখা যাচ্ছে বড় ধরনের ওঠানামা। সপ্তাহের শুরুতে বড় পতনের পর বৃহস্পতিবার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
জাপানের প্রধান শেয়ার সূচক এক পর্যায়ে সাতশ পয়েন্টের বেশি পড়ে যায়। গত সপ্তাহের তুলনায় সূচকটি তিন হাজারের বেশি পয়েন্ট নিচে নেমে গেছে। একই সময় দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার শেয়ারবাজারেও পতন লক্ষ্য করা গেছে।

তেলের দাম বাড়ায় নতুন উদ্বেগ
ইরানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি আশি ডলারের বেশি হয়েছে, যা মাত্র এক সপ্তাহে প্রায় বিশ শতাংশ বৃদ্ধি।
বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম বাড়তে থাকলে তা সরাসরি মুদ্রাস্ফীতি বাড়াবে এবং বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সামনে কঠিন সময়
উচ্চ তেলের দাম ও দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা এশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ের মতো অর্থনীতি আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানি ও পণ্যের দাম বাড়লে তাদের মুদ্রাস্ফীতি দ্রুত বাড়তে পারে এবং আমদানি ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে।
এর ফলে বাণিজ্য ভারসাম্য দুর্বল হবে এবং মুদ্রার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















