মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছর পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে তার নীতির বিরুদ্ধে রায় দেওয়া ফেডারেল বিচারকদের কঠোর ভাষায় আক্রমণ করে আসছেন। তিনি তাদের কখনও ‘বেপরোয়া’, কখনও ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’, আবার কখনও ‘পাগল’ বলে উল্লেখ করেছেন। ট্রাম্প ও তার মিত্রদের বক্তব্যে এসব বিচারিক সিদ্ধান্তকে শুধু ভুল নয়, বরং অবৈধ বলেও তুলে ধরা হয়েছে।
তবে বিষয়টি শুধু বক্তব্য বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধ নয়। রয়টার্সের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে পরিকল্পিতভাবে এমন আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে যাতে ফেডারেল বিচার বিভাগের ক্ষমতা সীমিত করা যায়।
জরুরি আবেদনের মাধ্যমে নীতি বাস্তবায়নের চেষ্টা
গত এক বছরে ট্রাম্প প্রশাসন সুপ্রিম কোর্টে বহু জরুরি আবেদন করেছে। এসব আবেদনের লক্ষ্য ছিল নিম্ন আদালতের বিচারকদের রায় স্থগিত করিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি দ্রুত কার্যকর করা।
নিম্ন আদালতের অনেক বিচারক এসব নীতির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ফলে প্রশাসন সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়।

রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের বিচার বিভাগ সুপ্রিম কোর্টে মোট ৩১টি জরুরি আবেদন করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৯৭ শতাংশ ক্ষেত্রে দাবি করা হয়েছে যে সংশ্লিষ্ট বিচারক সংবিধান ও আইনের অধীনে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতায় অযথা হস্তক্ষেপ করেছেন।
অন্যদিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন চার বছরে সুপ্রিম কোর্টে ১৯টি জরুরি আবেদন করেছিল। এর মধ্যে মাত্র ২৬ শতাংশ ক্ষেত্রে বিচারকদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ তোলা হয়েছিল।
প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়ানোর কৌশল
আইন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক বিচারকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো বিচারকদের সেই ক্ষমতা দুর্বল করা যার মাধ্যমে তারা প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করতে পারেন।
ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন স্কুলের অধ্যাপক পায়ভান্দ আহদুত বলেন, প্রশাসনের যুক্তিগুলো শুধু আদালতের রায়কে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা নয়; বরং বিচারকদের নির্বাহী সিদ্ধান্ত যাচাই করার ক্ষমতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।
তার মতে, প্রশাসন একতরফাভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে চাইছে এবং শক্তিশালী বিচারিক তদারকি তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা বারবার পরীক্ষা করেছেন। ফলে তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শত শত আইনি চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে।

তবে সুপ্রিম কোর্টের ৬–৩ রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠ বেঞ্চ, যার তিনজন বিচারপতি ট্রাম্প নিজেই নিয়োগ করেছিলেন, বেশিরভাগ জরুরি মামলায় তাকে সমর্থন দিয়েছে।
এই রায়গুলোর মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন ফেডারেল কর্মীদের বরখাস্ত করা, স্বাধীন সংস্থার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, ট্রান্সজেন্ডারদের সেনাবাহিনীতে নিষিদ্ধ করা এবং অভিবাসীদের এমন দেশে ফেরত পাঠানো যেখানে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই—এ ধরনের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পেরেছে।
সাধারণ মামলার তুলনায় জরুরি আবেদনের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট দ্রুত সিদ্ধান্ত দেয় এবং সাধারণত দীর্ঘ লিখিত যুক্তি বা মৌখিক শুনানি ছাড়াই রায় দেয়।
বিচার বিভাগের ব্যাখ্যা
বিচার বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, তাদের আইনি যুক্তিকে অস্বাভাবিক বলা বিভ্রান্তিকর। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টে প্রশাসনের উচ্চ সাফল্যের হারই দেখায় যে অনেক ক্ষেত্রেই আদালত প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেয়।
তার মতে, অভিবাসন নীতি বা ফেডারেল কর্মীবাহিনী পরিচালনার মতো বিষয়ে ঐতিহাসিকভাবেই আদালত প্রেসিডেন্টের প্রতি কিছুটা নমনীয় থাকে।
তিনি বলেন, সংবিধানের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে নির্বাহী ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে, তাই সেই ক্ষমতা রক্ষায় প্রশাসনের দৃঢ় অবস্থান স্বাভাবিক।
বিচারকদের ক্ষমতা নিয়ে আরও প্রশ্ন
ট্রাম্প প্রশাসনের জরুরি আবেদনের মধ্যে প্রায় ৬৮ শতাংশ ক্ষেত্রে দাবি করা হয়েছে যে সংশ্লিষ্ট বিচারকের এই মামলার ওপর বিচারিক এখতিয়ারই ছিল না।
বাইডেন প্রশাসনের আবেদনের ক্ষেত্রে এই যুক্তি মাত্র ১৬ শতাংশে দেখা গিয়েছিল।
এছাড়া ট্রাম্প প্রশাসনের ৭১ শতাংশ আবেদনে বলা হয়েছে যে বিচারকদের নীতিমালা স্থগিত করার মতো আদেশ দেওয়ার ক্ষমতাও ছিল না। বাইডেন প্রশাসনের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৬৩ শতাংশ।

দুই প্রশাসনই সুপ্রিম কোর্টকে অনুরোধ করেছিল তথাকথিত ‘সার্বজনীন নিষেধাজ্ঞা’ সীমিত করতে—যেসব আদেশে একটি আদালতের সিদ্ধান্ত পুরো দেশে নীতি বাস্তবায়ন বন্ধ করে দেয়।
গত জুনে সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ রায় দেয় এবং বিচারকদের ক্ষমতা কিছুটা সীমিত করে ট্রাম্প প্রশাসনকে বড় জয় এনে দেয়।
তবে ওই মামলাটি ছিল জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার ট্রাম্পের উদ্যোগ নিয়ে। আদালত তখন নীতিটির বৈধতা নিয়ে সরাসরি সিদ্ধান্ত দেয়নি। এই বিষয়ে শুনানি নির্ধারিত রয়েছে ১ এপ্রিল।
জরুরি মামলায় সীমিত ব্যাখ্যা
জরুরি মামলাগুলোতে সুপ্রিম কোর্ট প্রায়ই সংক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত দেয়। ফলে প্রশাসনের কোন যুক্তি আদালত গ্রহণ করেছে তা স্পষ্ট বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
উদাহরণ হিসেবে, ট্রাম্প যখন স্বাধীন ফেডারেল সংস্থাগুলোর কয়েকজন ডেমোক্র্যাট সদস্যকে বরখাস্ত করেন, তখন নিম্ন আদালত সেই সিদ্ধান্ত আটকে দেয়। এতে দুটি শ্রম বোর্ড, একটি ভোক্তা সুরক্ষা সংস্থা এবং ফেডারেল ট্রেড কমিশনের কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
বিচার বিভাগ তখন যুক্তি দেয় যে আদালত এসব বরখাস্তের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করতে পারে না এবং কর্মকর্তাদের পুনর্বহাল করার ক্ষমতাও নেই।
সুপ্রিম কোর্ট শেষ পর্যন্ত বরখাস্তের সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে দেয়, তবে খুব সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেয়। সেখানে আগের কয়েকটি রায়ের উল্লেখ করা হয় যেখানে প্রেসিডেন্টকে নির্বাহী কর্মকর্তাদের অপসারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।

সমালোচনা ও উদ্বেগ
ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচক ও কিছু বিচারক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে প্রশাসনের কর্মকর্তারা কখনও কখনও নিম্ন আদালতের আদেশ উপেক্ষা করছেন। একই সঙ্গে বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে মৌখিক আক্রমণও অব্যাহত রয়েছে।
এমনকি ট্রাম্প নিজেও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের সমালোচনা করেছেন। গত মাসে তিনি তার বৈশ্বিক শুল্কনীতির বিরুদ্ধে রায় দেওয়া বিচারপতিদের ‘বিদেশি স্বার্থের প্রভাবিত’ বলে মন্তব্য করেন।
টেক্সাসের সাবেক ফেডারেল বিচারক বারবারা লিন বলেন, প্রশাসনের আইনি অবস্থান বিচারিক ক্ষমতার খুব সীমিত ব্যাখ্যা তুলে ধরছে।
তার মতে, যদি এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার ভারসাম্য বা ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
ক্ষমতা দখলের অভিযোগ
ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক আইনি নথিতে বিচারকদের বিরুদ্ধে ক্ষমতা দখলের অভিযোগ আনা হয়েছে।
ফেডারেল কর্মীদের ব্যাপকভাবে বরখাস্ত করার পরিকল্পনা আটকে দেওয়ার মামলায় বিচার বিভাগ সুপ্রিম কোর্টকে জানায় যে এটি সংবিধানিক কাঠামোর ওপর চলমান আক্রমণ এবং আদালতই কেবল এই ক্ষমতার দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে পারে।
শিক্ষক প্রশিক্ষণ অনুদান কমানোর সিদ্ধান্ত আটকে গেলে প্রশাসন অভিযোগ করে যে বিচারকরা নির্বাহী বিভাগের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অবৈধভাবে হস্তক্ষেপ করছেন।

অভিবাসীদের এমন দেশে পাঠানোর পরিকল্পনা সীমিত করলে বিচার বিভাগ বলে, এতে অভিবাসন নীতিতে নির্বাহী ক্ষমতা ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি
কিছু আইন বিশেষজ্ঞ মনে করেন, অভিবাসন বা পররাষ্ট্রনীতির মতো বিষয়ে প্রেসিডেন্টকে আগে থেকেই যে ছাড় দেওয়া হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন সেটিকে আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন ইউ বলেন, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসের নেতৃত্বে আদালত ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্টের কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমতা বাড়িয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন সেই প্রবণতাকে আরও এগিয়ে নিতে চাইছে।
জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এরিক সেগাল বলেন, বিচার বিভাগের এই নতুন কৌশলে প্রায় প্রতিটি মামলাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যেন বিচারকদের হস্তক্ষেপ হলে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাই ধ্বংস হয়ে যাবে।
নেভাদার অবসরপ্রাপ্ত ফেডারেল বিচারক ফিলিপ প্রো বলেন, এই কৌশলে বিচারকদের প্রায় বাধা হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
তার মতে, প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি এমন যে তারা যা করতে চায়, যখন করতে চায় এবং যেখানে করতে চায়—সেটি আদালত বাধা দিতে পারে না।

ফেডারেল রিজার্ভ গভর্নরকে অপসারণের বিতর্ক
ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর লিসা কুককে অপসারণের চেষ্টা ঘিরে এক মামলায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে প্রশাসনের যুক্তি হয়তো অতিরিক্ত কঠোর।
কংগ্রেস ফেড কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা দিলেও ট্রাম্প কুককে বরখাস্ত করার চেষ্টা করেন। অভিযোগ ছিল বন্ধক জালিয়াতির, যা কুক অস্বীকার করেছেন।
একজন ফেডারেল বিচারক সেই বরখাস্তের সিদ্ধান্ত আটকে দেন। এরপর সুপ্রিম কোর্ট জানুয়ারিতে বিরল মৌখিক শুনানির আয়োজন করে।
শুনানিতে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস প্রশাসনের আইনজীবীকে বলেন, যদি অপসারণের কোনো কারণ থাকে, তাহলে আদালতের পক্ষে কর্মকর্তাকে পুনর্বহাল করার ক্ষমতা নেই—এমন দাবি সঠিক হতে পারে না।
এই মামলার রায় যে কোনো সময় ঘোষণা হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















